Saturday, August 09, 2008

ক্লোজআপ ওয়ান এবং সেরা কন্ঠ সম্পর্কে মন্তব্য

বাংলাদেশে বহুল সমাদ্রিত, প্রশংসিত ক্লোজআপ ওয়ান ও সেরা কন্ঠ নিয়ে আমার অনেকদিন ধরে কিছু কথা বলার ছিল। বলব বলব করে কোথাও কখনো বলা হয়নি। আজ নিজের অজান্তেই এ নিয়ে এখানে লিখতে মন চাইল। তাই কীবোর্ডে বসে গেলাম।
এনটিভির বিখ্যাত ক্লোজআপ ওয়ান গত ২০০৫ ও ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়ে বহু প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলার জনতার। নতুন নতুন শিল্পী বেড়িয়ে এসেছে এই মহা উদ্যোগের মাধ্যমে। এর জন্য অনেকাংশেই ইউনিলিভারকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। নোলক কিংবা সালমার মত গ্রাম-গঞ্জের সুরের ভান্ডার এ ধরনের বড় প্রচেষ্টা ছাড়া বেড়িয়ে আসত না কখনোই।
কিন্তু গত দু'বারই এবং এবার ২০০৮ এও দেখছি একই ঘটনা। যেসব দিক মনে করছি পরিবর্তন করা হবে পরের বছর করা হচ্ছে না। অবশ্য এর জন্য কখনো বলিওনি। কিন্তু যা ছিল সেটাকেও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বলি। গত দু'বার দেবাশীষকে ব্যবহার করা হয়েছিল উপস্থাপক হিসেবে। "পথের প্যাঁচালী" উপস্থাপনা করে ভীষণ নামকরা হয়েছিলেন দেবাশীষ। কিন্তু কী যেন অজানা কারণে (কমপক্ষে আমার অন্তত অজানা) দেবাশীষের মত একজন অভিজ্ঞ উপস্থাপককে বাদ দিয়ে এবার প্রাক্তন দুই প্রতিযোগী ক্লোজআপ ওয়ানের আবিদ ও পুতুলকে নেয়া হয়েছে। যদিও দেবাশীষ এক থাকলেও মহিলা উপস্থাপিকাটি গত দু'বারই পরিবর্তিত হয়েছিল, তাই পুতুলকে নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। কিন্তু আবিদ কেন? দেবাশীষের মত এত ভালো উপস্থাপক থাকতে একজন রবীন্দ্র সংগীতের শিল্পী! যা হোক, আমি বলছি না, আবিদ ও পুতুল খারাপ উপস্থাপনা করছে। কিন্তু যদি দেবাশীষ থাকত, তাহলে মনে হয় অনুষ্ঠানটাতে আরো প্রাণ খুঁজে পেতাম।
একটি প্রতিযোগিতায় অবশ্যই কেউ ভালো করবে, কেউবা খারাপ। এখন যে খারাপ করবে তাকে তিরস্কার করে কিছু বলা সব ক্ষেত্রে মানায় না। ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়। যেসব বিচারকরা বসেন প্যানেলে তারাও কি ভুলের গন্ডি থেকে মুক্ত? যেসব তরুণ শিল্পীরা কন্ঠে সুর তোলে তাদেরকে ভীষণ রকম উৎসাহ দিয়ে যান ক্লোজআপ ওয়ানের ফাদার জাজ (মূল বিচারক) আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। কিন্তু আগেরবারের মত এবারও, বরং আরো বেশী করে শুধু ভুল বা খুঁতের তালে থাকেন আরেক বিচারক ফাহমিদা নবী। বুলবুল সাহেব একবার এভাবেও বলেছেন ফাহমিদা নবীকে যে, উনি ছেলেদের গান শুনলে বলেন "বাহ! বাহ!" আর মেয়েদেরটা শুনলে "যাহ! যাহ!" অনেক শ্রোতা মন্তব্য করেছেন (একটা সাইটে দেখেছিলাম) ফাহমিদা নবী নাকি চাননা কোনো আধুনিক গানের ভালো শিল্পী উঠে আসুক এই প্রতিযোগিতা থেকে, নাহয় ওনার প্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতে। এ কি ধরনের চিন্তা-ভাবনা! জানি না এ রকম ধারনা ওনার আদৌ আছে কিনা।
এরপর বলি বৈষম্যের কথা। এবার সবচেয়ে বেশী আঘাত পেয়েছি দেবু এবং শেফালী নামের দুটি খাঁটি শিল্পীকে বাদ দেয়া দেখে, তাও আবার সেরা ৪০-এর পরেই। এদের স্থাণ আসলে আমার মতে সেরা দশের কমে হওয়া অনুচিত। শেফালীকে যদিও বিচারকরা উচ্চ নম্বরই দিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশীদের এলাকাপ্রীতির কারণে সে বাদ পড়ে। শেফালীর এলাকায় (রাঙামাটি) নাকি মোবাইল নেটওয়ার্ক নাই, অথচ বাংলাদেশ সরকার (বর্তমান এবং পুরাতনেরা) দেশকে নাকি কত উন্নতির দিকে ধাবিত করছে। আর দেবুর বেলায় যদিও সে ভালো গেয়েছিল অন্যান্য আট-দশজনের চেয়ে এবং বিচারকেরাও কোন ভুল ধরতে পারেনি, কিন্তু তাকে সেই বিচারকরাই প্রদান করে মাত্র ৩৮ নম্বর ৫০ এর মধ্যে, যেখানে আরেকজন প্রতিযোগীর (আশা) ভুল স্বয়ং ফাহমিদা নবীই ধরেন পেয়ে যায় ৪২। এসব কি ঘটেছে শুধুমাত্র দেবু একজন হিন্দু ছেলে বলে?
এর পরের পর্বে আসে পলবাসা (আমেরিকা প্রবাসী)। এই প্রতিযোগীর গান শুনলে অনেকেই মনে করবে এর বাংলা গানের উচ্চারণ সঠিক না। অথচ বিচারকরা (বিশেষ করে ফাহমিদা নবী) কি এক অজানা কারণে পলবাসার বিদায়ে কেঁদে ফেলেন। এমনকি যখন স্মৃতি (আরেক প্রতিযোগী) এবং পলবাসার মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বলেন উপস্থাপকরা, ফাহমিদা নবী তখন তিনি ওপেনলি পলের পক্ষ নেন। আর একজন সুদক্ষ বিচারক ইমতিয়াজ বুলবুল নিরপেক্ষতার সুরে বলেন, প্রয়োজনে দু'জনকেই তিনি রাখতে চান। এই না হলে বিচারক? বিচারককে তো হওয়া চাই, সুদক্ষ, গানের সম্পর্কে বিজ্ঞ (আমি বলছি না আমি বিজ্ঞ, তবে যতদূর বুঝি সে থেকেই বলছি)।
এইবারের দেবু ও শেফালীকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি ও অন্যান্য অনেকে ক্লোজআপ ওয়ান কর্তৃপক্ষকে ইমেইল করি। কিন্তু একি, তারা তো ফিরিয়ে আনা দূরের কথা এদের ব্যাপারে আমরা যে এত বললাম এর স্মরণটুকুও করলো না। অথচ এরাই আবার বলে দর্শকদের দ্বারাই ক্লোজআপ ওয়ান চলে। দর্শকরাই বড় বিচারক।

এই কারণে আমি চ্যানেল আইতে প্রদর্শিত 'সেরা কন্ঠ' দেখতে শুরু করি। আর দেখি একি! এখানে তো বাংলাদেশের কিংবদন্তী দুই সংগীতের কোকিল সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লা বিচারক। কিছু পর্বে (সম্ভবত প্রিলিমিনারী রাউন্ডে) সুবীর নন্দী, কনক চাঁপা, আবিদা সুলতানাকেও দেখলাম বিচারকের আসনে। এমন সুবিখ্যাত শিল্পীদের দিয়েই তো হবে প্রতিযোগিতা। আর এই ফাহমিদা নবী কিংবা পার্থ বড়ুয়া দিয়ে কি চলে? একজন ব্যান্ডের শিল্পী কি ঠিকমত বুঝবে পল্লী বা লালনগীতির মর্ম? যেহেতু বেশীরভাগ ক্লোজআপ ওয়ানের প্রতিযোগীরা লালনগীতি, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি গেয়ে থাকে, তাহলে ফরিদা পারভীনের চেয়ে উত্তম কেউ কি আছে বিচারকের আসনে বসবার জন্য?

তাই সবকিছু বিচার বিবেচনা করে আমি কিছু প্রস্তাব রাখতে চাই এই দুটি সম্পর্কে। যদি কোন সৎ ব্যক্তির দৃষ্টি আড়ে এই প্রস্তাবনাগুলো তাহলে আশা করছি উত্তমই হবে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের।
প্রস্তাবনাগুলো এই=>
### এই দুটো প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানকে ('সেরা কন্ঠ' ও 'ক্লোজআপ ওয়ান') এক করা হোক। এতে করে নানামুখী প্রচেষ্টার মাধ্যমে দশজন দশজন করে শিল্পী প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বের না করে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আরো বেশী সংখ্যক (২০ থেক ২৫ জনের মত) শিল্পী বের করে আনাই ভালো। আর এনটিভি বা চ্যানেল আই দুটিই একসাথে সম্প্রচারের দায়িত্ব নিতে পারে এক্ষেত্রে। আর অনুষ্ঠানটিকে আরো বড় পরিসরে করে "বাংলাদেশী আইডল" বা এ জাতীয় কোনো নাম দেয়া যেতে পারে।
### বিচারকের প্যানেলে তিনজন বা দু'জন না বসিয়ে আরো বিস্তৃত করে পাঁচজন দিলে ভালো হয়। আর পাঁচজনের মধ্যে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, ফরিদা পারভীন, সাবিনা ইয়াসমিন বা রুনা লায়লা, সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোর বা কুমার বিশ্বজিৎ বিচারকের জন্য সবচেয়ে ভালো হয়। এতে সবদিক দিয়ে অনুষ্ঠানটা পরিপূর্ণতা লাভ করবে।
### যেহেতু অনেকবার দেখা গেছে এসএমএসের কারণে ভালো প্রতিযোগিতারা বাদ পড়েছে, তাই এসএমএসের ব্যবস্থাটা সেরা দশ বা সেরা পনেরর সময় আনা হলে ভালো হয়। এতে করে ভালো কারো বাদ পড়ার সম্ভাবনাটা কমে যায়। সেই সাথে একজন প্রতিযোগীর পয়েন্ট পাবার সিস্টেমটাও রিভিউ করে নতুন করে অন্য ফর্মুলা দ্বারা চালানো উচিত। যেমন, ৫০% বিচারকদের দ্বারা আর ৫০% দর্শকদের এসএমএসের দ্বারা না করে, ৭৫% বিচারকদের এবং ২৫% দর্শকদের মাঝে বন্টন করা উচিত। কারণ অনেকবারই পরিলক্ষিত হয়েছে, দর্শকরা এলাকাপ্রীতি করে ফলে ভালো গায় কিংবা না গায়, কিন্তু দর্শকেরা নিজ অঞ্চলের হলে একজন প্রতিযোগীকে বেশী ভোট দেয়। অথচ ভুলে যায়, একজন বেসুরোর শিল্পী হবার চেয়ে একজন যোগ্য ব্যক্তির শিল্পী হবার প্রয়োজনীয়তা। আর মোট কথা, আমরা তো সবাই বাংলাদেশী, কে নোয়াখালী বা চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার সেটা বড় কথা না, আমাদের মনে রাখা উচিত আমরা সকলে বাংলাদেশী।
### একটি পর্বে কোন কোন প্রতিযোগীকে নেয়া হবে সে ব্যাপারটি আরো পরিস্কার হওয়া উচিত। কিসের ভিত্তিতে কিছু কিছু (সাধারণত ৮-৯ জন) প্রতিযোগীকে এক পর্বে নেয়া হয়? এক্ষেত্রে মিলিয়ে কিছু ভালো কিছু গড় আর কিছু মোটামুটি ধরনের প্রতিযোগীকে নিয়ে এক একটি পর্ব গঠন করা উচিত। এতে করে এ ব্যবস্থাটিতে স্বচ্ছতা থাকবে।
### যদি দেখা যায় কোনো ভালো প্রতিযোগী বাদ পড়ে গেছে দর্শক ভোটের কারণে (যদি এসএমএস সেরা চল্লিশজনের জন্য আনা শুরু হয়), তাহলে কোনো ধরনের ওয়াইল্ড কার্ড সিস্টেম বা এ জাতীয় কিছুর মাধ্যমে ভালোদের আবার ফেরত আনা উচিত। কারণ জনগণকে যতই বোঝানো হোক না কেন, জনগণ যদি এলাকাপ্রীতি করেই তাহলে এর চেয়ে ভালো কিছু কি হতে পারে।

আপাতত এই আমার মন্তব্য এ দুটি প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান সম্পর্কে। আশা করছি আপনারা ভিজিটররাও মন্তব্য আকারে আপনাদের পরামর্শগুলো এখানে রাখবেন। আর কোনোভাবে যদি এটি উচ্চ মহলে যেতে পারে তাহলে আমার এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে মনে করব।

No comments:

Post a Comment