Friday, November 21, 2008

প্রথম অপেরাতে গেলাম

অপেরা (বা গীতিনাট্য) সম্পর্কে তেমন জানতাম না। এবার একটা ইলেক্টিভ ক্লাস হিসেবে নিতে হয়েছিল এটিকে। অনেক কিছুই জানলাম অপেরা সম্পর্কে, এর ইতিহাস, সময়ের সাথে এর ব্যাপ্তির কথা। ওলফগ্যাং এ্যামেডিউস মোজার্ট, হ্যান্ডেল, মোন্টেভের্ডি, পুচিনি - এদের সকলের নানা অপেরা সম্পর্কে জানলাম। ক্লাসের একটা প্রজেক্ট ছিল, টার্মের শেষদিকে একটা লাইভ অপেরা শো দেখে রিপোর্ট লিখতে হবে। সেটি করতেই গত শনিবার নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন অপেরা হাউজে গেলাম।
টিকেট পাইনি $৪২ এর কমে। যদিও $১৫ ছিল কিছু, কিন্তু সেগুলো বুকড। তাই প্রায় ৭টা বড় ডিভিশনের মধ্যে সর্বশেষটাতে গিয়ে পড়ি। প্রথমে মেট্রোপলিটন হাউজের সামনে এসেই থমকে দাঁড়াই। ইয়া বড়ো কাঠামো। কখনো এ ধরনের মুভি থিয়েটার (অপেরা হাউজকে মুভি থিয়েটার জাতীয়ই মনে করতাম) দেখি নাই তো! যা হোক, টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছিল বলে গিয়েই ঢুকে পড়ি যদিও শো শুরু হবার কথা রাত ৮টায়, কিন্তু আমি পৌঁছে গেছি প্রায় ৭টার মধ্যেই।
ঢুকে কাউন্টার থেকে আমার ওয়েব প্রিন্ট-আউটটা দেখিয়ে টিকেটটা নিই। ওটাকে রিপোর্টের সাথে জমা দিতে হবে। তাই যত্নের সাথে রাখতে হবে ওটাকে। আজ রাতের শো হলো, পুচিনির "ম্যাডাম বাটারফ্লাই" (ইটালিয়ানে উচ্চারিত হবে "মাদাম বাটারফ্লাই")। ইচ্ছা ছিল মোজার্টের "দ্য ম্যাজিক ফ্লুট" বা "ডন জিভানী" দেখব। কিন্তু ইদানীং কালে সেগুলো হবে না, পরবর্তী ফেব্রুয়ারীতে।
যা হোক, প্রায় সাড়ে সাতটায় আমাদের দর্শকদের ঢুকতে বলা হলো মূল শো উপভোগের স্থাণে। সাপের মতো পেচানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে শেষ তালায় উঠে গেলাম। রিফ্রেশমেন্টের জন্য ওয়াইন-হুইস্কি দেয়া আছে আমার তালায়। আমি মনে মনে বলি, দরকার পড়লে না খেয়ে থাকব, তবুও এসব ছাই-পাশে মুখও দেব না।
মূল কক্ষে গিয়ে আমি তো অবাক। এত্ত বড় হলরুম! সাতটি লেভেল করে করে বানানো এটির এত উপরেই আমি যে একটু হলে সিলিং ধরতে পারব মনে হয়। আর সবচেয়ে নিচ তলার লোকজনকে এত পিচ্চি লাগছিল দেখতে যে, আমার গা শিউরে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে। কী যে করি! চটপট সিটে বসে যাই যাতে সোজা তাকিয়ে থাকতে পারি, নিচে তাকাতে না হয়। তবুও নিচে তো তাকাতেই হবে শো দেখতে হলে। একটু সময় যেতে যেতে স্বাভাবিক হতে লাগলাম।
কিন্তু যা আগে থেকে ভাবছিলাম তাই হলো। প্রথম এ্যাক্ট শুরু হবার ২০-২৫ মিনিটের মধ্যেই আমার ঘুম ঘুম ভাব পাচ্ছে। ইদানীং কালে কোনোকিছু তেমন মজা না লাগলে (বিশেষ করে রাত সাড়ে আটটায়, গতদিনটা ঘুমাতে পারি নাই) শুধু ঘুম ঘুম পায় যা আগে হতো না। যাক, প্রায় ৪৫ মিনিট পর প্রথম এ্যাক্ট শেষ হবার পর যখন সকলে তালি দিল, তখন টের পেলাম। ৫-৭ মিনিটের বিরতি দিল। আমি এমন চিপায় ছিলাম যে, এতগুলো মানুষকে ডিঙিয়ে বাথরুমে যাব করেও যাওয়া হলো না।
এভাবে করে পরের এ্যাক্টের প্রথমাংশ শেষ হবার পর এমন আরেকটি বিরতি পেলাম। এরপরে ফাইনাল অংশে ঘুমের মধ্যেও জোর করে চোখগুলোকে খুলে রাখার চেষ্টা করলাম। আগেরবারগুলোর চেয়ে মনযোগ দিয়েই এবার দেখতে পারলাম। হঠাৎ সামনের এক ব্যক্তির সিটের পেছনে দেখলাম একটা স্ক্রোলিং বারে ইংরেজী সাবটাইটেল লিখছে। এতক্ষণ ইটালিয়ান শুনতে শুনতে কিছুই বুঝছিলাম না ঘটনার (যদিও মূল গল্প আগেই জানা ছিল)। সাথে সাথে আমার সামনের সিটের স্ক্রোলিং বার এক্টিভেট করে দিলাম একটা লাল বাটনে টিপ দিয়ে। সারা অপেরার (প্রায় তিন ঘন্টার) এতক্ষণ (প্রায় আড়াই ঘন্টা) কিছুই বুঝলাম না। আর এই বাটনটা টিপ দিলে কত আগেই না এসব ঘটনা অভিনয় আর সংগীতের সাথে বুঝতাম। যা হোক, মন্দের ভালো যে তাও কিছুটা তো পেলাম। নাহয় তো এ ব্যাপারটা হয়তবা অজানাই থেকে যেত।
এরকম এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে তিন ঘন্টার অপেরা শেষ করে রাত এগারটায় বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। ঘরে এসে রাত একটায় খাটে পড়েই ঘুম। আর কি! এবার নিশ্চিন্তে শুধু ঘুম! অপেরা কেন এতো বোরিং লাগলো। কত আশা নিয়ে গেলাম। অথচ গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গিয়ে এমন হলো কেন? জানিনা হয়ত গতদিনের কম ঘুমের কারণে কিংবা অন্য কারণে। তবে এই সুযোগে একটা অপেরা হাউজের ভেতরখানা তো দেখা হলো। বাপ-দাদার জনমে এমন জায়গা কেউ দেখেছে নাকি!

এই সপ্তাহের প্রথমেই এই বিরল অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু লেখাপড়ার চাপে আর পেরে উঠিনি।

No comments:

Post a Comment