Tuesday, June 30, 2009

পোকোনোস ঘুরে এলাম

গত শনিবার (২৭শে জুন, ২০০৯) ঘুরে এলাম পেনসিলভ্যানিয়া (Pennsylvania) রাজ্যের পোকোনোস (Poconos) থেকে। মূলতঃ এখানকার একটি গ্রুপের সাথে বনভোজনের উদ্দেশ্যেই যাত্রা। তবে ওয়েবে এই স্থাণটি সম্পর্কে জেনে আমার মনে হচ্ছিল এটা যতটুকু বনভোজনের স্পট এর চেয়ে দর্শনীয় স্থাণ।
বাঙালী সবসময়ই টাইম নেয় যেকোনো কাজে। ফলে সাড়ে আটটার বাস যাত্রা গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দেয় প্রায় এগারটার দিকে। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রীজ পেরিয়ে নিউ জার্সীর উপর দিয়ে পেনসিলভ্যানিয়া পৌঁছাই প্রায় দুপুর ২টার দিকে। পথে একটা বিষয় বার বার লক্ষ্য করছিলাম যে, যতই গন্তব্যটির কাছে পৌঁছাচ্ছিলাম ততই ঘন ঘন বৃষ্টি পড়ছে। আঁচ করতে পারছিলাম সেসময় যে, আমরা রেইন ফরেস্টের দিকে এগোচ্ছি। একটু বৃষ্টি পড়ে আবার এই যায় চলে। এ যেন মেঘ আর সূর্যের এক লুকোচুরি খেলা। বাসের ভিতর থেকে আকাশটা অবশ্য ভালো বোঝা যাচ্ছিল না। তবে একেবারে সামনের সিটে বসার ফলে সামনের দিগন্তে একবার মেঘ একবার সূর্য আমার চোখে পড়ছিল।
যা হোক, বনভোজনের জন্য যেহেতু এসেছি, তাই লোকজন স্বাভাবিকভাবেই খাবারের জন্য ভীষণ মরিয়া হয়ে ছিল। যদিও বাসে নাস্তা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু দুপুর দুটার দিকে বাঙালীর পেট ভাতের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ফলে ঘোরাঘুরি খাবারের পরে করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আসলে আমার নিজেরও ক্ষুধায় পেট চো চো করছিল। উদ্যোক্তাগণ সহকারে অন্যান্যদের খাবার শেষ করতে করতে প্রায় সাড়ে তিনটা বেজে যায়।
এরপর উদ্যোক্তাগণের মধ্যে একজন আমাদের সকলের উদ্দেশ্যে জানালেন পোকোনোসের Bushkill Falls (যাকে পেনসিলভ্যানিয়ার নায়াগ্রা বলা হয়) এ ঢুকতে প্রত্যেকের দশ ডলার করে লাগবে। উনি একে একে সকলের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেন। আমরা প্রায় চারটার দিকে ঢুকলাম জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে। এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো, আমরা কিন্তু খাবার-দাবার সেরেছি মূল পোকোনোসের সামনে পিকনিক অংশটিতে। মূল জায়গায় এবার আমরা ঢুকলাম।
ওরে বাবা! এ কেমন কাঠামো! এর আগে আমার নায়াগ্রা জলপ্রপাত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু এই জলপ্রপাত সেটার চেয়ে ভিন্ন। পাহাড়ে-পর্বতে ঘেরা, রেইন ফরেস্টের মধ্যে, চিকন করে আসা জলের স্রোত আসছে আর ঝরে পড়ছে অনেক নিচে। লোকজনের ঘোরার জন্য তারা পাহাড়ের সাইডগুলো দিয়ে সিঁড়ির মতো করে দিয়েছে যাতে জলপ্রপাতটার চারপাশ দিয়ে ঘোরা যায়। আমাদের মধ্যে মধ্যবয়স্কী লোকজন ছিল বেশী। তাই একটু-আধটু ঘুরেই পা ব্যথা হয়ে যায়।
এমন করে ঘোরার মাঝেই হঠাৎ করে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এমনই বৃষ্টি যে লোকজন সব যে যার জায়গায় থেমে যায়। বলে রাখা ভালো, এতক্ষণ যে আমরা ঘুরছিলাম তখনও বৃষ্টি একটু-আধটু পড়ছিল। কিন্তু এবার হঠাৎ করেই মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। আমার সাথের গাইডটাকেই মাথায় ঠেকিয়ে যতটুকু পারি বৃষ্টি থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা করি। বৃষ্টি একটা সময় ক্ষীণ হয়ে আসলে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে আবার উপরে উঠে ফেরত যাওয়া শুরু করি। পেছনে তাকিয়ে দেখি কিছু লোক এখনো দাঁড়িয়ে আছে এই ভেবে বৃষ্টি একেবারে থামবে। কিন্তু তাদের কে বোঝাবে এটা যে রেইন ফরেস্ট!
যা হোক, ফেরত গিয়ে যখন বের হয়ে যাব তখন আরো দুইজন সমবয়সীকে দেখে জানতে চাইলাম তারা কি পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখেছে কিনা নাহয় তো দশ ডলারই বৃথা। ঘোরা হলো না এক ঘন্টাও। ওরাও বলল, ওরা পুরোটা স্থাণ ঘোরেনি। ফলে ওদের সহিত গেলাম সাইডগুলো মিলে পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখতে। আমার মাকে পাঠিয়ে দিলাম ফিরে যাবার জন্য যাতে বিশ্রাম নিতে পারে। বয়স্ক বেশীরভাগ লোকই ফিরে গেল আর ইয়াং ছেলে-পেলে আমরা কয়েকজন গেলাম পুরো ট্রেইলটা ঘুরে দেখতে।
এবার প্রায় বনের ভেতরেই ঢুকে গেলাম। মনে হচ্ছিল জীবন্ত কোনো প্রাণীর দেখা মিলবে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, কিছুই চোখে পড়ল না। আর আমার যেহেতু পায়ে স্যান্ডেল ছিল সেহেতু ভয়ে ভয়েও ছিলাম। কখন জানি কিছু কামড় দেয় কিনা। অনেকখানি গিয়ে কিছু লোক দেখলাম। এই সময়টায় আমরা প্রায় হারিয়েই গিয়েছিলাম। ওসব লোকদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম বের হবার পথ কোথায়। তারা দেখিয়ে দিল এবং জানালো, আমাদের বের হতে হতে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগবে। ম্যাপ/গাইড দেখে বুঝলাম, পুরো এলাকাটা ঘুরতে আসলে ৩-৪ ঘন্টা লাগবে। ফলে পশ্চিম সাইডটাতে যাওয়ার প্ল্যান বাদ দেই। এবারের ঘোরার সময়ও খানিকক্ষণ সময় পরপর বৃষ্টি হয়। এতে আমার টি-শার্ট প্রায় পুরোটাই চুবে গেছে। শীত যদিও লাগছিল তবুও এমন একটা অভিজ্ঞতার স্বাদ ভালোই লাগছিল।
ফেরত আসার সময় একটা জায়গায় দেখলাম (যেখান থেকে জলের স্রোত আসছে এবং জল খুবই কম) লোকজন পয়সা ফেলছে আর উইশ করছে। আমাদের মধ্যেও দু'একজন নিজেদের উইশ করল। এরপর ব্যাক টু আমাদের পিকনিক স্পট।
এসে দেখি বড়রা গান-বাজনায় মেতে গেছে। পুরস্কার দেয়া-নেয়াও হচ্ছে। বাস ড্রাইভাররাও তাগাদা দেয়া শুরু করেছে। টাইম ওদের শেষ হবার পথে। ফলে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে আমরা রওয়ানা দিলাম নিউ ইয়র্ক সিটিতে আমাদের নিজ নিজ বাসার উদ্দেশ্যে। পথে চলল গান/ডিভিডি।
আনন্দ-হই-হুল্লোরের সাথেই দিনটা কাটিয়ে ভালোই লাগল।

No comments:

Post a Comment