Monday, July 13, 2009

কেউই কি বুঝলো না?

একটা ফোরামে কিছু ভাইদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে কিছু কথা আসে। যা আমি পরে চিন্তা করে কোনোকিছু ভেবে-চিন্তে বের করতে পারলাম না।
মূলকথায় আসি...

সনাতন ধর্মাবলম্বী হিসেবে ধরা হয় ঈশ্বর বিভিন্ন আবার এক। তিনি যেমনি সাকার আবার তেমনিই নিরাকার। তাঁর যেমনি কোনো রূপ নেই আবার তেমনি বহুরূপী। তাঁর যেমন আদি নেই তেমনি অন্তও নেই। আবারও বলছি তিনি যেমনি অদ্বিতীয় তেমনি বহুবিধ। তা না হলে কি তিনি ঈশ্বর? সর্বশক্তিমান? পরমেশ্বর? সর্বোচ্চ আসনটিতে অধিষ্ঠিত তো তিনিই হতে পারেন যিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী। তিনি যেমনি চাইবেন তেমনিই হতে পারবেন।
আগেকার দিনগুলোতে মানুষজন ঈশ্বরকে রূপ দিয়ে পূজা-আরাধনা করত। এখনকার দিনে যদিওবা তা হয়, তবে বর্তমান কালে বেশীরভাগই নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনায় মগ্ন। পাঠককে একটা বিষয় আমি এখানে জানিয়ে দিতে চাই, তা হলো, বর্তমান সময়ের মুসলমানদের 'আল্লাহ' বা খ্রীষ্টানদের 'গড' সবাই কিন্তু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতেও ঈশ্বরই দাঁড়ায়। কারণ 'গড' বা 'আল্লাহ' যেমন নিরাকার তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও মনে করে ঈশ্বর সাকারও হতে পারে আবার নিরাকারও। খ্রীষ্টানরা বা মুসলমানেরা যেমন তাদের নামকরণে 'গড' বা 'আল্লাহ'কে সর্বশক্তিমান মানে, অদ্বিতীয়, এক, অভিন্ন মানে, তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও কিন্তু ঈশ্বর/ভগবানকে এক বা অভিন্ন জ্ঞানে জানে।
পাঠক এখানে একটা বিষয় হয়ত লক্ষ্য করবেন যে আমি 'সনাতন ধর্মাবলম্বী' বলছি 'হিন্দু ধর্মাবলম্বী' না বলে। কারণ, 'হিন্দু' শব্দটিই এসেছে প্রাচীন পারস্য/গ্রীকদের (পশ্চিমাদের) ভারতবর্ষ ভ্রমণকালে সিন্ধু নদের উপত্যকায় বসবাসকারী লোকজনকে উদ্দেশ্য করে। যেহেতু তারা (পশ্চিমারা) 'স'-এর উচ্চারণ করতে অসক্ষম ছিল তাই তারা এর স্থলে 'হ' এনে "হিন্দু" শব্দের উৎপত্তি ঘটায়। এর ইংরেজী নাম দেয় তারা "Indu" (Plural- Indus)। ধারণা করা হয়, এ থেকেই India শব্দটির উৎপত্তি। যেমনভাবে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পর সেখানকার স্থাণীয়দের নাম দেয় "Red Indian" (কারণ তিনি মনে করেছিলেন তিনি ইউরোপ থেকে ইন্ডিয়াতে এসে পড়েছেন, তাই লোকজনকে Red Indian লাল বর্ণের জন্য নামকরণ করে)। তাই বলে কি ইতিহাস দেখেনি এইসব লোক আসলে কোথাকার ছিল? এদেরকে পরবর্তীকালে বই-পুস্তকে Native Americans বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তেমনিভাবে আজ যদি আমরাও সেই প্রাচীন পারস্যদের ন্যায় সিন্ধু নদের উপত্যকায় বসবাসকারী লোকদের "হিন্দু" বলে থাকি, তাহলে কি আমরাও একই ভুল করছি না?
যা হোক, আমার মূল কথা এ নিয়ে ছিল না। আমি এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাই যে, প্রত্যেকটি ধর্ম-বিশ্বাস তাদের নিজেদের মতাদর্শ নিয়ে গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের সন্ধিক্ষণ সেইখানেই যেখানে আমরা সকলে এক। যেমনভাবে নদী-নালা সকলে গিয়ে সেই সাগরে গিয়ে মেশে, তেমনি করে আমরা (মুসলিম, খ্রীষ্টান, সনাতন ধর্মীরা) সকলেই কিন্তু একই সর্বশক্তিমানের আরাধনা করছি। আজ যদি আপনার এলাকায় বন্যা-সাইক্লোন শুরু হয় তখন একজন মুসলিম যেমন আল্লাহর নাম নেবে তেমনি একজন সনাতন ধর্মীও ভগবানের নাম নেবে। তখন যদি বন্যা-সাইক্লোন বন্ধ হয়ে যায় ওপরওয়ালার কৃপায় তখন কি এটা আল্লাহর গুণে হয়েছে নাকি ভগবানের? নাকি এটা সত্য যে, তারা সবই তো এক যেকারণে মুসলিমের নামাযে বা সনাতন ধর্মীর প্রার্থনায় একইজনের শরণাপন্ন হয়েছে মানবজাতি। তখন তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন।
এ নিয়ে লিখলে অনেকই লেখা যায় কিন্তু আমি যতটা পারি সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করব।
একটা উদাহরণ দেবার চেষ্টা করছি এখানে: একজন লোক (মুসলিম) যদি এ্যাক্সিডেন্ট করে তখন তার জরুরী রক্তের প্রয়োজন পড়ল। এখন যদি তার রক্তের গ্রুপ এ-নেগেটিভের সাথে আরেকজন লোকের (সনাতন ধর্মী) রক্তের মিল পাওয়া যায়, তখন কি তার রক্ত মুমূর্ষ লোকটির কাজে লাগবে না? রক্তের বর্ণ কি মুসলিম বা সনাতন ধর্মীর ভিন্ন। নাকি দুইই লাল? তাই বলে কি বলব এ ওর থেকে এসেছে (ধর্মানুসারে) নাকি বলব আমরা সকলেই তো একই মানবজাতির অংশ তাই আমাদের সকলই এক হওয়াটাই স্বাভাবিক।
তাহলে যদি মানবজাতির একাত্মতা থাকে দেহে, মনে (বৈজ্ঞানিক ও মানসিকভাবে) তখন কি আমরা এও বলতে পারি না যে, ঈশ্বর/আল্লাহ/গড একই। যেমনি করে ঈশ্বরের ক্ষমতা আছে বন্যা-সাইক্লোন হঠাৎই বন্ধ করে দেবার তেমনি আল্লাহরও তো আছে একই শক্তি। তাহলে পার্থক্যটা কোথায় থাকল? নাকি আমরা মানবজাতিই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদটা তৈরি করেছি?
নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন। দেখবেন কথাগুলো যা বললাম তা সত্যই।

[কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার জন্য এ লেখা নয়। শুধুমাত্র আমাদের মানুষদের মধ্যে যে দূরত্ব সে দূরত্বকে যতটুকু পারি ঘুচানোর চেষ্টা। যদি এতে আরো ধর্মীয় বিভেদ তৈরি হয় তাহলে আমার প্রচেষ্টা শুধু বৃথাই হবে না, অনর্থক ধরে নেব।]

No comments:

Post a Comment