Wednesday, January 06, 2010

প্রসঙ্গ: রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ

রাম মন্দির ও বাবরি মসজিদ সম্পর্কে কিছু কথা অনেকদিন ধরেই বলব বলব করে বলা হচ্ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিককালে নয়াদিগন্তের একটা খবর পড়ার পরে এ বিষয়ে লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছি।

প্রথমেই আসি কিছু অতীত ইতিহাসে। হিন্দু ধর্মের ভগবান বিষ্ণু অষ্টম অবতার রাম নামে ৭৩০০ BC এর দিকে পৃথিবীতে আসেন রাক্ষস রাবণকে বধ করবার জন্যে। অযোধ্যা নামক নগরীতে রাজা দশরথের ঘরে জন্ম নেন রাজপুত্র হিসেবে।

এরপর ১৫২৭ AD এর দিকে মুঘল সম্রাট বাবর এসে শ্রীরামের জন্মভূমিস্থল অযোধ্যায় মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৯৪০ এর পূর্বে এটির নাম ছিল "মসজিদ-ই-জন্মস্থাণ"। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন কার জন্মভূমিস্থল বোঝানো হচ্ছে। এমনকি সম্রাট বাবরও সেই জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করলেও নামের মধ্যে রেখে গেছেন এর সংকেত। পরবর্তীকালে এর নাম পরিবর্তন করে বাবরি মসজিদ নির্ধারিত হয়।

১৯৯২ সালে একদল উগ্রবাদী হিন্দু বাহিনী সেই বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলে। এতে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয় যার ফলে ঘটে যায় কিছু মর্মান্তিক হানাহানির ঘটনা। অঞ্চলটিকে ঘিরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লেগেই থাকে। অন্যদিকে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট আজও এর সুরাহা করতে পারেনি।

এবার আমার মূল বক্তব্যে আসি। মুঘল সম্রাট ভারতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ভারতবর্ষের নানা স্থাণে মসজিদ, প্রাসাদ, দুর্গ ইত্যাদি তৈরি করতে থাকেন। কিন্তু এত অন্যান্য জায়গা থাকতে কেন তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থভূমি অযোধ্যায় (যেখানে হিন্দুরা বিশ্বাস করে তাদের একজন ভগবানের অবতার জন্ম নিয়েছিলেন হাজার হাজার বছর আগে) মসজিদ করতে গেলেন? এটা কি তিনি হিন্দুদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে পুণ্যস্থাণ গ্রাস করার চেষ্টা নাকি অন্য কিছু? যদি ধরে নেই তিনি তৎকালীন সময়ের হিন্দু অধ্যুষিত মানুষদের মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত করতে চাচ্ছিলেন, তাহলে এটা কি মুসলিমদের ধর্ম প্রচারে আগ্রাসী ভূমিকা না যা কিনা আজকে মার্কিনরা করছে ইরাক, আফগানিস্তানে? যদিও মার্কিনীদের উদ্দেশ্য ধর্ম প্রচার নয়, আধিপত্য বিস্তার বা অন্য কিছু, কিন্তু মার্কিনীদের যদি আগ্রাসী ভূমিকার জন্য দোষী বলা যায়, তাহলে কি সেসময়ের মুঘল সম্রাট একই দোষে দোষী নন?

বিষয়টাকে যদি আমি একটু অন্যভাবে দেখি যে, আজ মুসলিমদের পুণ্যস্থাণ হিসেবে স্বীকৃত মক্কা-মদীনার মতো অঞ্চল যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লী জড়ো হন হজ্ব বা অন্যান্য ধর্মীয় উদ্দেশ্যে, সেইখানে যদি হিন্দু দেব-দেবীর মন্দির বা খ্রীষ্টানদের গীর্জা নির্মিত হয়, তাহলে কি সেটা ঠিক হবে? এই ধরনের ভূমিকা কি হিন্দু বা খ্রীষ্টানদেরকে আগ্রাসী ধর্মান্ধ বা ধর্মপ্রচারক (যে নামেই আখ্যা দেয়া হোক না কেন) হিসেবে প্রমাণ করবে না? সেই একই ভূমিকায় যখন মুঘল সম্রাট বাবর ছিলেন, তখন কি তাকেও মুসলিম আগ্রাসী ধর্মপ্রচারক বলা ভুল হবে?

আর তাই যদি মেনে নেই, তাহলে কিছু হিন্দুর একটি মসজিদ ভাঙ্গন (যেখানে তাদের বিশ্বাসে তাদের দেবতার এই পৃথিবীতে জন্মভূমি বলে চিহ্নিত) কি খুবই অন্যায়? আজ যদি মক্কা-মদীনার মতো ইসলামিক ইতিহাসে পবিত্র ভূমি এইসব স্থাণে হিন্দু মন্দির বা খ্রীষ্টান গীর্জা গড়ে ওঠে, তাহলে কি মুসলিমরা একযোগে তাদের পুণ্যস্থাণ বাঁচাতে লড়বে না? তাহলে সেই একই অজুহাতে যদি কিছু হিন্দু তাদের পুণ্যভূমি পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালাতে গিয়ে মসজিদ ধ্বংস করে, তাহলে সেটা কি খুবই অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে?

আসলে এই লেখা লেখার উৎসাহ পেয়েছি যখন কিছু মুসলিম ভাই আমাকে তাদের ধর্মের নানা সু-দিকগুলো তুলে ধরেছিলেন আমারই এক প্রশ্নের জবাবে। তাদের কথায় বুঝতে পেরেছি, জানতে পেরেছি, মুসলিম ধর্মগ্রন্থ কোরআনের নানা দিক। কিন্তু এই যদি আসল বাস্তব দাঁড়ায়, তাহলে কিভাবে মেনে নেয়া যায় আপনারাই বলুন?

একজন মুসলিম যেমন চাইবে না তার ধর্মের পুণ্যভূমি মক্কা-মদীনায় মসজিদের বদলে অন্য কোনো ধর্মের উপাসনালয় থাকুক, তেমনি একজন হিন্দুও তো চাইবে না তার ধর্মীয় পুণ্যস্থাণে কোনো অন্য ধর্মের উপাসনালয় থাকুক। তাহলে ভারতীয় মুসলিমদের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নিয়ে সংঘর্ষ কতটা যুক্তিযুক্ত আপনারাই বলুন?

সবশেষে এটুকু বলতে চাই যে, কারো ধর্মে আঘাত করে অন্য ধর্ম যদি আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তাহলে সেই আধিপত্য বিস্তারকারীর এই কথা ভুললে চলবে না, There is a supreme power over him।

[আর উপরের লিংকে দেয়া খবরটি ইদানীংকালে একটা ফোরামের মাধ্যমে জানতে পেরে এ বিষয়ে অনেক কিছু কথা যা অনেকদিন ধরেই বলব বলব করে বলা হচ্ছিল না, তা এক সুযোগে বলে ফেললাম।]

No comments:

Post a Comment