Thursday, December 06, 2012

ধর্ম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন

অনেকদিন ধরে এই বিষয়টি গঠিত হচ্ছিল মনের মধ্যে। যতই দর্শন শাস্ত্রের নানা বুদ্ধিজীবীদের লেখা পড়েছি ততই এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা আরো ঘনীভূত হতে থাকে। মূল বিষয়ে আসি -


ঈশ্বর কি একনায়ক?

ভগবান বা ঈশ্বর বা আল্লাহ কি একজন dictator (একনায়ক)? একনায়কেরা তাদের প্রজাদের দমিয়ে রাখেন যাতে করে লোকজন তাকে ঈশ্বরের ন্যায় পূজা করে। যত যত বড় বড় একনায়ক ছিলেন ইতিহাসে তারা সকলেই কিন্তু তাদের জনগণকে তাকে আরাধনা করার জন্য বাধ্য করতেন। ঈশ্বরও তো তাই, নয় কি? আমাদের সকলকেই, হিন্দু হই, মুসলিম হই, খ্রীষ্টান বা বৌদ্ধই হই, আমাদেরকে ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বর বা আল্লাহকে সর্বশক্তিমান হিসেবে মেনে নিতে হয়। কিন্তু কেন? সর্বশক্তিমান তিনি হবেন কেন? তাহলে তো সাদ্দাম বা গাদ্দাফীর সাথে ঈশ্বর বা আল্লাহর পার্থক্য কি রইল? আমাদের যদি মন থেকে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি জন্মে তবেই না আমরা তাঁকে পূজা করব। তিনি কেন কোরআন বা গীতার মাধ্যমে আমাদেরকে বলবেন তাঁকে সর্বশক্তিমান জেনে পূজা করতে? বাধ্য করে যেমনভাবে একনায়কেরা আমাদেরকে বলে তাঁকে মানতে, তেমনভাবেই তো ঈশ্বর আমাদেরকে বলছেন তাকে সম্মান করতে। স্ব-ইচ্ছার কি হলো? আমাদের কি স্বেচ্ছায় কিছু করার সুযোগ নেই? আমাদের স্বাধীনতা তাহলে কোথায় গেল? পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত হতে আমরা পাকিস্তানী বা বৃটিশদের আমাদের পূর্বপুরুষদের ভিটে-মাটি থেকে উৎখাত করি। অথচ জন্ম থেকেই আমরা যেই ঈশ্বরের কল-কাঠির পুতুল সেই ঈশ্বরের কাছ থেকে তো আমরা যে স্বাধীন নই, সে বিষয় কখনো উপলব্ধি করি না? করি কি? 

নাকি এই পুরো বিষয়টিই সমাজের সৃষ্টি? সমাজই আমাদেরকে এমনভাবে গঠন করেছে যে আমরা ঈশ্বর বা আল্লাহকে একনায়কের মতো দেখি? সমাজের হর্তা-কর্তারাই কি এটি নির্ণয় করেন? সাধারণ জনগণ কি বিনম্র হয়ে এটি শুধু মেনে নেয়? 

তাহলে কি দাঁড়ালো?
ঈশ্বর কি সমাজের রূপায়িত প্রতীক যা সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের দ্বারা তৈরি করা এক রূপ যেটিকে ব্যবহার করে সমাজকে নিখুঁতভাবে নাড়াচাড়া করা হয়?


পাপ-পুণ্য বলে কি আদৌ কিছু আছে?

পাপ-পুণ্য কে নির্ণয় করেন? যদি ঈশ্বর নির্ণয় করেন, তাহলে তো তিনিই পাপ-পুণ্য দুইয়েরই তৈরিকারক। তাঁর সৃষ্টি আমরা সকলে - এমনটি বলেই জেনে এসেছি এতকাল। তাহলে তিনিই তো আমাদের পাপ বা পুণ্য করান। আমরা যদি নিজেরা নিজেদের মর্জিমত চলি, তাহলে তো আমাদেরকেই পাপ-পুণ্যের জন্য দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু আমরা কি নিজের মর্জিমত চলতে পারি? ঈশ্বর তো নিজেই বলেছেন তিনি আমাদের তৈরি করেছেন। তিনিই আমাদের চালান। এমনটিই ধর্মীয় গানে শুনেছি - "...তুমি যেমনি চালাও, তেমনি চলি, মা..."।

কোনটিকে পাপ বলব? একটি ল্যাংরা ছেলে বাবা মারা যাওয়ার পর অসুস্থ মা, ছোট বোনকে নিয়ে গঠিত সংসার চালানোর জন্য কাজ খুঁজতে যায়। কোনো লোকই তাকে কাজে নেয় না কারণ সে অতি ছোট, হয়তবা কাজ ঠিকমত করতে পারবে না। ফলে সে বাধ্য হয়ে স্থাণীয় ক্যাডারদের দলে যোগ দেয়। চুরি-ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ে। তাহলে তার কর্মটি কি পাপ? তাহলে পুণ্য কি?

আবার পুণ্যের ক্ষেত্রেও এমন উদাহরণ দেয়া যায়। একজন ধনকুব অনেক ছলচাতুরী করে ব্যবসা করে। ব্যবসায় লোকজনকে ঠকিয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে। কোটিপতি হওয়ার পর সে হাজার মানুষের কর্মসংস্থাণের ব্যবস্থা করেন। স্থাণীয় মন্দিরে-মসজিদে গরীবদের প্রতি মাসে কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা করেন। প্রতি সপ্তাহে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া সে স্থাণীয় বৃদ্ধদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রমও খুলে দেয়। তাহলে জীবনের প্রথমে সে যে ছলচাতুরী, বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে এত ধনের মালিক হয় সেটা কি পাপ নয়? তাহলে পরবর্তী জীবনে সে যে কাজগুলো করলো, সেগুলো কি পুণ্যকর্ম নয়? যদি জীবনের প্রথমদিকে সে ওই পথ অবলম্বন না করত, তাহলে হয়ত সে পরবর্তীতে এমন কাজগুলো করতে পারতেন না। তাহলে সেই পাপকাজ তিনি যদি না করতেন, তাহলে কি পরবর্তী পুণ্যকর্মগুলো সম্ভব হতো?


এবারে কিছু প্রশ্ন সরাসরি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে ...


মহাকাশ কালো কেন?

শ্রীমদভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে আখ্যা দিয়েছেন "আলো" বলে। বিভূতি যোগে তিনি বলেছেন "তিনি প্রকাশ/আলো"। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় এই যে বিশাল মহাকাশ, সেটি কালো কেন? ঈশ্বর যদি আলো বা প্রকাশ হোন, তাহলে এই বিশাল, অসীম মহাকাশ কেন কালো হবে? মহাকাশ তো ঈশ্বরেরই অংশ। তাহলে ঈশ্বরের মাঝে এই বিশাল, অসীম মহাকাশ কালো হওয়া সত্ত্বেও কেন শ্রীকৃষ্ণ বললেন, তিনি প্রকাশ/আলো? বরং আমাদের দৃষ্টিতে সূর্যের তুলনায় কিংবা এত অজস্র তারার তুলনায় মহাকাশ তো অনেক বড়। তাহলে আমাদের চোখে কেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এতটুকু বিস্তৃতি দিবেন যাতে করে মহাকাশে কালো অংশটাকে আমাদের এতো বড় লাগে সূর্যের বা তারাদের তুলনায়?


ঈশ্বর কি দাম্ভিক নন?

শ্রীমদভগবদগীতার দশম অধ্যায়ের বিভূতি যোগে শ্রীকৃষ্ণ নিজের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে নানা জিনিসের মধ্যে নিজের রূপটির কথা তুলে ধরেছেন অর্জুন তথা সমগ্র জগতবাসীর সামনে। সেখানে যতগুলো উদাহরণই দেখি না কেন প্রায় সবগুলোতেই তিনি নিজেকে সর্বোচ্চটির সাথে তুলনা করেছেন। যেমন - দেবতাদের মাঝে ইন্দ্র, দেবর্ষিদের মাঝে নারদ, গান্ধার্বদের মাঝে চিত্ররথ, হাতিদের মাঝে ঐরাবত, সর্পদের মাঝে শেষনাগ, দৈত্যদের মাঝে প্রহলাদ, পাখিদের মাঝে গরুড় ইত্যাদি। এখন এসব উদাহরণগুলো থেকে আমরা দেখতে পারি যে, ঈশ্বর নিজেকে সবকিছুর মধ্যে শ্রেষ্ঠগুলো (অন্তত মানব সমাজ যেসবকে শ্রেষ্ঠ বলে ধরে নেয়) সেসবের সাথে তুলনা করেছেন। এর মানে কি এই দাঁড়ায় যে বাকি সবকিছুর মাঝে তিনি নেই? আর যদি থাকেনই তাহলে কেন নির্দিষ্ট করে এসব উদাহরণগুলো দিয়েছেন অর্জুন তথা পৃথিবীবাসীর সামনে? আর যদি অন্য কিছুর মাঝে তিনি না থাকেন, তাহলে অন্য সব কিছুর মাঝে কে? পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলেই বাবার আদর পাব, আর নাহয় পাব না - এটা কি অনেকটা এমনটাই হয়ে গেলো না?

তাছাড়া, এসব উদাহরণ দিয়ে তিনি কি প্রমাণ করতে চাইছেন? তিনি এগুলোর মধ্যে আছেন। অর্থাৎ তিনি যা কিছু শ্রেষ্ঠ, সবই তিনি। তাহলে আমি যদি গর্ব করে বলি আমি অমুক রাজবংশে জন্ম নিয়েছি। আমাদের রাজপ্রাসাদ আছে। আমাদের এতো বিশাল জমি-জমা আছে। তখন কেন লোকে বলে আমি দাম্ভিক? আমি অহংকারী? ঈশ্বরের বিভূতি যোগের বর্ণনাগুলো কি ঈশ্বরের নিজের মধ্যে অহংকারের প্রমাণ না? নাকি তিনি বললে অহংকার না, আমি-আপনি বললেই অহংকার হয়ে যায়?

আবার তিনিই তো গীতায় বলেছেন, আমাদের ত্রিগুণাতীত হতে। সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ। তিনি নিজেই এইসব গুণের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলেন না। আর আমাদের বলছেন এগুলো থেকে উপরে উঠতে। সেটা কি করে সম্ভব? আর যদি ধরে নেই, তিনি ত্রিগুণাতীত, তাহলে গীতাটা কি? ঈশ্বরের নিজের অহংকারের বুলি নয় কি?


ভগবান বিষ্ণু কেন গবীর পরিবারে জন্ম নেননি? 

ভগবান বিষ্ণুর দশাবতারে মধ্যে কোনোটিই কি প্রকৃত গরীব পরিবার ছিলো? প্রথম থেকে শুরু করি -

  • মৎস্য অবতার: এটি তো এক প্রাণী। এতে আর গরীব-ধনী কি আছে।
  • কূর্ম অবতার: একই অবস্থা। আরেক প্রাণী। গরীব-ধনীর প্রশ্নই আসে না। 
  • বরাহ অবতার: আগের দুইয়ের অবস্থা।
  • নৃসিংহ অবতার: এটি যদিও অর্ধেক প্রাণী অর্ধেক মানুষ, তবুও এটির ব্যাপ্তি বেশীসময়ের ছিলো না। ফলে ধনী-গরীবের কথা আসে না।
  • বামন অবতার: অন্যান্য সকল অবতারগুলোর মধ্যে দারিদ্রের সবচেয়ে কাছাকাছি গেছেন বামন অবতার। ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিতে হয়েছিল মহারাজা বলীর কাছে। এটি বাদে তেমন করুণ দারিদ্র অবস্থার শিকার হননি বামন অবতার।
  • পরশুরাম অবতার: যদিও ঋষি পরিবারে জন্ম এই অবতারের, তবুও তেমন করুণ দারিদ্রাবস্থায় পড়েননি পরশুরাম। 
  • রাম অবতার: সবচেয়ে ধনী অবতার বললে ভুল বলা হবে না। ১৪ বছর বনবাসের কথা বাদ দিলে তেমন কঠিন দারিদ্রের শিকার হননি রাম। 
  • কৃষ্ণ অবতার: তিনিও মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারেই বড় হন ছোটবেলায় নন্দের ঘরে। পরবর্তীতে কংসের মৃত্যুর পর রাজপ্রাসাদেই দিন কাটিয়েছেন বেশীরভাগ সময়।
  • বুদ্ধ অবতার: অনেকে মেনে নেন না গৌতম বুদ্ধকে দশাবতারের মধ্যে। কিন্তু অনেক শাস্ত্রেই বল গৌতম বুদ্ধ ভগবান বিষ্ণুরই দশাবতারের মধ্যে একজন। যতটুকু পড়ে জেনেছি, তিনি রাজ পরিবারেই জন্ম নেন। স্বেচ্ছায়ই গৃহত্যাগ করে অশ্বথ গাছতলায় ধ্যানে মগ্ন হোন ৪০ বছরের জন্য।
  • কল্কি অবতার: যদিও এখনো আসেননি, যতগুলো লেখায় পড়েছি তিনিও তেমন দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেবেন না। 

প্রশ্ন হলো, কেন বিষ্ণুর দরিদ্র পরিবারে জন্মের কথা বললাম? বর্তমান বিশ্বে অর্ধেকের বেশী মানুষই দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। অনেকের ঘরেই "দিন আনতে পানতা ফুরায়" অবস্থা। অথচ আমাদের পরমেশ্বর ভগবান প্রায় প্রতিটি বারই জন্ম নিয়েছেন স্বচ্ছল পরিবারে। কেন তিনি আমাদের শিক্ষা দিতে কোনো গরীব ঘরে জন্ম নিলেন না? গরীব হিসেবে বর্তমান বিশ্বে যে এতো মানুষ বাঁচে, তাদের উদাহরণ তৈরির জন্য কেন তিনি নিজে দারিদ্রতা কি সেটা বুঝতে, তার মর্ম first-hand অভিজ্ঞতা নিতে এমন পরিবারে জন্ম নেননি? গরীব হয়ে কি করে ভাই-বোন, অসুস্থ বাবা-মায়ের দেখভাল করতে হয়, আবার নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় - তার দৃষ্টান্ত রাখতে তিনি কি পারতেন না একটি করুণ গরীব ঘরে জন্ম নিতে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?


ঈশ্বরের দেহে এতো অলংকার কেন?

অন্য কারণটি কি তা আমরা তো ১০০% গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি না। তবে একটা অনুমান করতে পারি, ঈশ্বর বিলাসীতা পছন্দ করেন। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমাদের প্রায় সকল দেবদেবীর (বিশেষ করে দেবীদের) দেহে নানান অলংকার। ভানু বন্দোপাধ্যায়ের এক ছায়াছবিতে (নাম মনে করতে পারছি না) এই বিষয়টি ভানু তুলে ধরেছিলেন যে, কেন মা লক্ষ্মী এতো গহনা পড়ে থাকেন? সাদামাটা রূপধারী হয়ে ভক্তদের মাঝে উপস্থিত হতে সমস্যা কোথায়? বর্তমান বিশ্বের কথা বললে, কয়জনের ভাগে অলংকারের সমাহার জোটে? মায়ের এমন অলংকৃত রূপ দেখে বিশ্বের মহিলা মায়েরাও তো অলংকারের প্রতি আকৃষ্ট হবেন, তাই না? কিন্তু যারা হতদরিদ্র জীবন-যাপন করেন, তারা মায়ের এমন রূপ দেখবেন আর আফসোস করবেন। এমনটাই কি চান মা? দেবীরা?

যত বেশী পায়, তত বেশী চায়। কথাটার সাথে দ্বিমত পোষণ করলেও কথাটা যে সত্য তা না মানা অসম্ভব। আমরা যত দেখি, তত বেশী কামনা করি। ফলে ঈশ্বর নিজেই যদি নিজের রূপ এমনটি দেখান যাতে আমাদের কামনা বাড়তে পারে, তাহলে সেটা কেমন দাঁড়ায়?

আর যদি ধরে নেই, ঈশ্বরের অলংকৃত রূপ মানুষের আঁকা। এর সাথে বাস্তবের মা লক্ষ্মী বা দেবীদের তেমন সামঞ্জস্যতা নেই, তাহলে কেন আমরা যুগ যুগ ধরে এমন রূপের উপাসনা করে আসছি? কেন বদলে দিচ্ছি না? OMG! Oh My God! ছবিতে যেমন দেখিয়েছে ঈশ্বর যদি বর্তমান বিশ্বে আসেন তাহলে স্যুট-প্যান্ট পড়েই আসবেন, তাহলে কেন আমরাও আমাদের আরাধনার ঈশ্বরের রূপ এমনটি দিচ্ছি না? ক'জন আমরা তেমন পীতাম্বরধারী হয়ে ঘুরে বেড়াই?


আমরা কেন মহামায়ার উপাসনা করি যখন আমরা নিজেরাই মায়ার জাল থেকে মুক্ত হতে চাই?

মহামায়া হচ্ছে দেবী দুর্গার আরেক না। শব্দটিকে ভেঙ্গে অর্থ করলে দাঁড়ায়, মহান যে মায়া, সেই মহামায়া। অথচ আমরা নিজেরাই প্রতিনিয়ত শিখে আসছি এই মানব জন্ম হয়েছে মায়ার জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করে সেই পরমেশ্বরের সাথে নিজেকে বিলিন করে দেবার জন্য। ৮৪ লক্ষ জোনী পার হয়ে অনেক সাধের এই মানব জন্ম তো এই কারণেই - তাই নয় কি? তাহলে যদি আমরা সেই মায়া থেকে দূরে যেতে চাই, আমাদের তো উচিত মায়ার শক্তি থেকে যে আমাদের মুক্ত করতে সহায়তা করবে তেমন কাউকে উপাসনা করা। মহামায়া যদি মায়ার মহান ধূম্রজাল হয়, তাহলে কেন আমরা জেনে শুনে এমন জালে আরো নিজেদের বাঁধবো? আমি এক্ষেত্রে ধরে নিচ্ছি মহামায়া মায়ার মহান এক জালের আধার (ভুল হলে শুধরে দেবেন)।


কৃষ্ণ যেভাবে পৃথিবী ছাড়লেন সেটা কি আত্মহত্যার সমান না? 

জরা ব্যাধের বাণে কৃষ্ণ আক্রান্ত হয়ে দেহ রাখেন। এমনটিই জেনে এসেছি কৃষ্ণের পৃথিবী ত্যাগ সম্পর্কে। তাহলে কেন কৃষ্ণ কাপুরুষের ন্যায় এমন করে অবস্থাণ নিলেন যাতে করে জরা তাঁকে শিকার মনে করে? বরং তিনি যদি মনে করেন তাঁর যাওয়ার সময় এসেছে, তিনি তো জরার সাথে কিংবা অন্য কোনো যোদ্ধার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারতেন। বীরের মতো দেহ রাখতে পারতেন অভিমন্যুর মতো। আজ যদি কোনো লোক রেললাইনের ট্র্যাকে শুয়ে মরতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে লোকে উনার মৃত্যুর পর একে আত্মহত্যা বলে। কিন্তু মেরেছে কে? ট্রেনের চালক, তাই না? কিন্তু তবুও আমরা বলি, এটি আত্মহত্যা। কিন্তু কৃষ্ণের বেলায় কেন এটিকে আত্মহত্যা বলা হয় না?


দেবরাজ ইন্দ্র যা কিছু করেছেন তার পরেও কেন আমরা তাঁর আরাধনা করি?

দেবতাদের রাজা ইন্দ্র। অমৃত পান করে দেবতারা অমর। ফলে যা কিছুই করুক না কেন এঁদের মরণ নেই। রামায়ণ, মহাভারত পড়লে বা দেখলে অনেক উদাহরণ পাওয়া যায় ইন্দ্রের নানা দুষ্ট আচরণের। এ মূহুর্তে যেটি মনে পড়ছে (যেটিকে ইন্দ্রের অন্যতম দুষ্ট আচরণের একটি বলা চলে) সেটি হচ্ছে তাঁর সাথে অহল্যার দুর্ব্যবহার। গৌতম মুনি যখন গৃহে ছিলেন না (যেটি আবার চন্দ্রদেবের সাহায্যে) তখন গৌতম মুনি সেজে ইন্দ্র অহল্যার সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হবার চেষ্টা করেন। অথচ যখন গৌতম মুনি গৃহে ফিরেন, তখন তিনি অহল্যাকে দোষারোপ করেন এবং অভিশাপ দেন পাথর হয়ে থাকার যা পরবর্তীতে রামের স্পর্শে পাথর থেকে মানুষ রূপে ফেরত হয়।

কিন্তু আবার শাস্ত্রে অহল্যাকে পঞ্চসতীর একজন বলা হয়। তাহলে এমন উঁচু স্তরে স্থাণ পাওয়া অহল্যা কেন ইন্দ্রের দুশ্চরিত্র আচরণের জন্য শাস্তি ভোগ করেন? কেন গৌতম মুনি ইন্দ্রকে কোনো সাজা দেন না?

ইন্দ্রের এমন নানা উদাহরণ আছে শাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলিতে। এমন আচরণগুলোর উদাহরণ জানা সত্ত্বেও কেন আমরা ইন্দ্রদেবের উপাসনা করি? কেন এমন দেবতা অমর হবার সুযোগ পায়? কেন এমন আচরণশীল হয়েও তিনি স্বর্গের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত? ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ কেন এহেন আচরণের পরেও উনার বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নেননি?

আজকালকার দিনের সাথে উদাহরণ দিলে ইন্দ্র হচ্ছেন অনেকটা মন্ত্রীর ছেলের মতো যে কিনা যত খারাপ কাজই করুক না কেন (আধুনিক সমাজের মানদন্ডে) তবুও সে থাকে বহাল তবিয়তে। মন্ত্রী গিয়ে প্রতিবারই তার বখাটে ছেলের জন্য জামিন নিয়ে আসে। তেমনি দেবতারাও বার বার একটা কিছু গন্ডগোল বাধিয়ে দিয়ে ব্রহ্মা এবং পরবর্তীতে বিষ্ণুর কাছে ছুটে। আর বিষ্ণু তখন তাদের মন্ত্রীর মতো জামিনের ব্যবস্থা করে। কি উপমাটা কি ভুল দিলাম?


জন্মান্তরবাদ কিসের দ্বারা নির্ণায়িত? 

ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি হিন্দুধর্ম জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী। অর্থাৎ আমরা প্রত্যেকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরছি। যতক্ষণ সেই পরমেশ্বরকে লাভ করতে পারছি ততক্ষণ সেই চক্রে ঘুরব। ৮৪ লক্ষ জোনী পার হয়ে এই মানব জন্ম পেয়েছি।

এখন প্রশ্ন হলো, কিসের দ্বারা এই জন্মান্তরবাদ নির্ণয় করা হয়েছে? যা জেনেছি, সেটা হলো পূর্বজন্ম। পূর্বজন্মের কর্মফল। যদি তাই হয়, তাহলে প্রথম জন্মটি কিসের দ্বারা নির্ণায়িত হয়? ধরে নিলাম, প্রথম জন্মে সবাই একই প্রাণী (হয়ত কীট-পতঙ্গ) হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম। তাহলে কে আমাদের প্রথম জন্মের কর্মগুলো (কিংবা পরের জন্মগুলোর কর্মগুলোও) করান? আমরা যদি নিজেরাই করি, তাহলে ঈশ্বরকে কেন বলা হয় সর্বক্ষেত্রে বিরাজিত? এমনটিই তো বলেছিল প্রহলাদ তার পিতা হিরণ্যকশিপুকে বিষ্ণু সম্পর্কে। যদি সর্বক্ষেত্রে ঈশ্বর বিরাজিত হন, তাহলে তিনি কীট-পতঙ্গদের মাঝেও আছেন। তাহলে আমরা আসলে প্রথম থেকেই কিছু করছি না। সবই তিনি করান। ধর্মীয় গানেও এমনটিই বলা হয়েছে। আর যদি তাই হয়, তাহলে ঈশ্বর কি পক্ষপাত করছেন না কারো কারো সাথে? কাউকে রাজার ঘরে জন্ম দেয়ান আবার কাউকে গরীবের ঘরে? আর যদি তিনি না করান, তাহলে কে করান? আমরা নিজেরা? তাহলে কেন আমরা তাঁর পূজা করব যখন তিনি আমাদেরকে তাঁর নিয়ন্ত্রণেই রাখতে পারেন না? বরং আমাদের মন বা এমন কিছুর প্রার্থনা করা উচিত যাতে সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে, তাই নয় কি?


আপাতত এই প্রশ্নগুলোই থাক। পরে মাথায় আরো কিছু প্রশ্ন জমলে আবার করব।

আর হ্যাঁ, এই প্রশ্নগুলো কোনো ছবি (OMG! Oh My God! বা ভানু বন্দোপাধ্যায়ের কোনো ছবি) দেখে মাথায় আসেনি। এগুলো অনেক আগে থেকেই মাথায় ভাবনা খেলছিল। চিন্তা করছিলাম কাকে করব। পরে চিন্তা করে দেখলাম কোনো একক ব্যক্তির উত্তর না, যত বেশী লোককে করব, তত নানান কিংবা একই ধাচের উত্তর পাব। ফলে জ্ঞানের ব্যাপ্তিটা বাড়বে এসব সম্পর্কে। প্রশ্নগুলো পড়ে মনে করবেন না আমি এক নাস্তিক বা নাস্তিক হবার পর্যায়ে, কিংবা অন্য ধর্মে চলে যাব - এমন কিছুই না। যেহেতু আমি একজন হিন্দু, তাই হিন্দুধর্মটিকে ভালোভাবে বুঝতে চাই। সেই প্রচেষ্টাতেই এই প্রশ্নগুলো।

No comments:

Post a Comment