Monday, March 18, 2013

লোক দেখানো পুনর্বাসন


নোয়াখালীর রাজগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় লোক দেখানো পুনর্বাসন চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজগঞ্জের আলাদিনগর গ্রামের মালিবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরগুলোর ভিটিতে বরাদ্দকৃত ত্রাণের টিন দিয়ে নতুন ঘর করে দেওয়া হচ্ছে। পুড়ে যাওয়া ঘরের পুরনো দু-একটি কংক্রিটের খুঁটির সঙ্গে
সবগুলো বাঁশের খুঁটি ও রশি দিয়ে সিলিং বাঁধা হচ্ছে। একসঙ্গে দ্রুত চলছে ঘরের চাল নির্মাণের কাজ। বাঁশ এবং কাঠগুলো নিম্নমানের। উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা ইমদাদুল হক ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক এসবের তদারকি করছেন। পুনর্বাসনের নামে দ্রুত এরকম অস্থায়ী ঘর নির্মাণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বেগমগঞ্জ ইউএনও খন্দকার নুরুল হক সমকালকে বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘর করে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ত্রাণের টিন এবং নগদ টাকা দেওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্তরা ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি। সে জন্যই প্রশাসন ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে। নিম্নমানের বাঁশ-কাঠ ব্যবহারের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক ডা. এবিএম জাফর উল্যা সমকালকে বলেন, ঘর উঠে গেলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা এবং মন্দিরের জন্য এক লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগও করা হয়েছে।
গত ২৫ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জামায়াত সমর্থিত ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদের দু'দিনব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিল। মাহফিলে নেতৃত্ব দেন জামায়াত নেতা হেদায়েতুল ইসলাম। রাজগঞ্জ ইউনিয়ন জামায়াত এবং এই পরিষদের নেতা স্থানীয় হেদায়েতুল ইসলাম গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পরপরই দুই ছেলে মিজান ও মাহবুবকে নিয়ে পালিয়েছেন। বেগমগঞ্জ থানায় পুলিশের করা মামলায়ও নাম নেই তাদের পিতাপুত্রের কারোরই।
বর্বরোচিত ঘটনার নেতৃত্ব দানকারীদের নাম নেই_ এজাহারে এমন দাবি রাজগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের। গুলিতে নিহত মাছ ব্যবসায়ী লিটনের নাম এজাহারে থাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এজাহারভুক্ত কাউকেই গত ১১ দিনে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। বুধবার পর্যন্ত ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হলেও বৃহস্পতিবার থেকে পুলিশ নতুন করেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। স্থানীয়দের মতে, জামায়াতের ফারুক, সাইফুল্যাহ, খলিল, শাহজাহান বিএনপির সাদ্দাম, সোহাগ, ইউসুফ খানসহ যারা এ নারকীয় হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই নাম নেই এজাহারে। এ ছাড়া হামলাকারীদের বেশিরভাগই ছিল বাজারের পার্শ্বর্বর্তী দুই কসাইবাড়ির। পুলিশ ঘটনার পরপরই কসাইবাড়িতে অভিযান চালালে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা এবং হামলার নেতৃত্ব দানকারীদের গ্রেফতার করা যেত।
পুলিশের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইব্রাহিম খলিল কসাইবাড়ির লোকজনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে সমকালকে বলেন, প্রথম দিন গ্রেফতার হওয়া ৬ জনকে এজাহারভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জামায়াত নেতা হেদায়েত ও তার ছেলে মাহবুবের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। মাহফিল থেকে ধর্মীয় উস্কানির বিষয়টিও নিশ্চিত করেন তিনি।
এদিকে সাংগঠনিক ব্যর্থতার কারণে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাজগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও গত ৯ দিনেও তা কার্যকর হয়নি। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে যারা পারে না তাদের কমিটি রেখে লাভ কী। বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. এবিএম জাফর উল্যা জেলা আওয়ামী লীগের নির্দেশনার বিষয়টি স্বীকার করলেও কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়নি বলে জানান।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসএম শাহীন পারভেজকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসএম শাহীন পারভেজ সমকালকে বলেন, শিগগিরই তিনি রিপোর্ট জমা দেবেন। এদিকে জেলা পুলিশের তদন্ত কমিটির কার্যসীমা আরও ৩ দিন বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মাহবুব রশিদ।
গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. মিজানুর রহমান খান, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. নওশের আলী এবং বিজিবির সেক্টর কমান্ডার জাহিদ রাজগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুদের মন্দির ও বাড়ি পরিদর্শন করেন।


(সংগৃহীত) 

No comments:

Post a Comment