Wednesday, April 17, 2013

ইসলামে মানবিকতা

একটা অসাধারণ ঘটনা সবার সাথে শেয়ার না করে পারছিনা ।

১৯৯০ এর দশকের শেষভাগ । স্থানঃ চট্টগ্রামের শ্রদ্ধেয় একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের বৈঠকখানা । তিনি সেই বৈঠকখানার পাশের কক্ষে বিশ্রামরত । বৈঠকখানায় উপস্থিত আছেন তাঁরই একজন ইংরেজি শিক্ষিত অনুসারি এবং একজন খাদেম । এমন সময় সেখানে পাঞ্জাবি-পাজামা পরা টুপি বিহীন একজন ভদ্রলোক এলেন এবং খুব কুণ্ঠিত ভাবে খাদেম এর কাছে জানতে চাইলেন "হুজুর সাহেব আছেন?" সেই ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোকটি "হুজুর সাহেব" সম্বোধন শুনে একটু অবাক হয়ে তাকালেন আগন্তুকের দিকে । খাদেম একটু উচ্চস্বরেই বললেন যে হুজুর বিশ্রামে আছেন, পরে দেখা করতে হবে । আগন্তুক চলে যেতে উদ্যত হয়েছে, কিন্তু খাদেমের কথা ভেতর থেকে হুজুর শুনে ফেললেন । এবং বললেন এই, বাইরে কে এসেছেন? তাঁকে ভেতরে নিয়ে এসো । ওই আগন্তুক ভেতরে গেলেন, বেশিক্ষন থাকলেন না । বেরিয়ে এসে বৈঠকখানায় বসলেন । খাদেম মারফত হুজুর তাঁর সেই ইংরেজি শিক্ষিত অনুসারিকে ডেকে পাঠালেন ভেতরে । অনুসারি ভদ্রলোক ভেতরে গেলে তাঁকে হুজুর ওই আগন্তুকের ব্যাপারে বললেন "বাইরে যে ভদ্রলোক বসে আছেন, তিনি একজন হিন্দু । তাঁর মেয়ে কঠিন অসুখে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি । পাঁচ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন । চিকিৎসার ব্যায়ভার মেটানও কষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার পক্ষে। লোকমুখে শুনেছেন এই হুজুর ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সাহায্য করেন, কেউ খালি হাতে ফেরেনা, তাই ভয়ে ভয়ে হুজুরের কাছে এসেছেন ।" এরপর হুজুর তাঁর সেই অনুসারিকে নির্দেশ দিলেন পাঁচজন রক্তদাতা জোগাড় করতে যারা সাধারনত আধুনিক পোষাক-আশাক আর চালচলনে অভ্যস্ত । এর পর ওই অনুসারির হাতে আট হাজার টাকা দিয়ে বললেন রক্ত দেয়ার কাজ শেষ হওয়ার পর গোপনে ওই আগন্তুকের হাতে টাকাটা তুলে দেয়ার জন্য । অনুসারি তা-ই করলেন । এরপর আরও একবার হুজুর ওই একই অনুসারিকে দিয়ে আরও কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন । এর পর ওই হিন্দু ভদ্রলোকের মেয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল ।

এর বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা, ওই হিন্দু ভদ্রলোক ওই অনুসারি ভদ্রলোকের সাথে এক জুমার দিন দেখা করে বললেন যে তিনি একটু হুজুরের সাথে দেখা করতে চান । নামাজের তখনও একঘন্টা বাকি । তাই অনুসারি ভদ্রলোক হুজুরকে গিয়ে বললেন যে "হুজুর আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন" । হুজুর তখন বললেন যে "নামাজের পর দেখা করতে বল" । ভদ্রলোক আবার আগের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বললেন "হুজুর ইনি সেই হিন্দু ভদ্রলোক" । হুজুর এবার বেশ রূঢ়ভাবেই বললেন "বললামনা নামাজের পর দেখা করতে বল" । অনুসারি ভদ্রলোক কিছুটা অবাক আর অনেকটা মনমরা হয়ে ওই হিন্দু ভদ্রলোককে জানালেন যে হুজুর নামাজের পর দেখা করবেন । ওই ভদ্রলোক রাজি হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন । নামাজ শেষে ওই ভদলোক হুজুরের সাথে একান্তে দেখা করে বললেন "হুজুর, আমার বিপদের সময়ে আপনি যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন, তাতে আমি অভিভুত হয়ে যাই । এরপর মেয়ে সুস্থ হয়ে গেলে আমি ইসলাম সম্পর্কে জানা শুরু করি । এখন আমি, আমার স্ত্রী এবং সন্তান-সন্তুতি মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা ইসলাম গ্রহন করব।" শুনে হুজুর বললেন "খুব ভাল কথা । তা আপনার পরিবারের সবাই কি রাজি?" তিনি বললেন "জি রাজি" । তারপর হুজুর জানতে চাইলেন "আপনার কি মা বেঁচে আছেন? তাঁর বয়স কত? তিনি কি রাজি আপনাদের এই ব্যাপারে?" তিনি বললেন যে তাঁর মা বেঁচে আছেন, তাঁর বয়স ৮০-র উপরে এবং তিনি তাদের এই ধর্মান্তরের ব্যাপারে রাজি হননি, বরং বেশ নাখোশ । হুজুর সাথে সাথে বললেন "তাহলে আপনি এখনি ফিরে যান বাড়িতে, চেষ্টা করুন তাঁকে রাজি করাতে । যদি খুশিমনে রাজি হন, তাহলে আমি আপনাকে কলেমা পড়াতে রাজি আছি । আর যদি রাজি না হন, তবে আপনাকে ধর্মান্তরিত করার ফলে জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে আপনার মায়ের মনে আমৃত্যু যে যন্ত্রণার, কষ্টের সৃষ্টি হবে, তা আমার এই পর্যন্ত সমস্ত এবাদত বরবাদ করে দেবে!" এ কথা শুনে ওই ভদ্রলোক ফিরে গিয়েছিলেন, এবং মায়ের মৃত্যুর পরই তিনি সপরিবারে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন !

এই হচ্ছে ইসলামের মানবিকতার অপার সৌন্দর্য যা সস্তা সওয়াব-গুনাহর হিসাব এক পাশে রেখে মনুষ্যত্বের জয়গান গায় ! এই হচ্ছে সত্যিকারের ইসলাম, যা আন্তধর্মীয় সহাবস্থান ও সম্মানকে অসীম গুরুত্ব দেয় । এখানে যে পীর সাহেবের কথা বলা হয়েছে, তিনি আমার এবং আমার বাবার পীর মরহুম মৌলানা আব্দুল জব্বার (রঃ), যিনি চট্টগ্রাম বাইতুশ শরফ এর মাধ্যমে আমৃত্যু আর্ত-মানবতার সেবা করে গেছেন । আর যে ইংরেজি শিক্ষিত অনুসারির কথা বলেছি তিনি আমার শ্রদ্ধেয় বাবা জনাব তাহের সোবহান । আমি পুরো ঘটনা আমার বাবার কাছে শুনেছি, যা তিনি তাঁর নিজের সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করেছেন ।
(কৃতজ্ঞতায়: Zia Us Sobhan)

No comments:

Post a Comment