Monday, April 22, 2013

স্বদেশপ্রেমী এক মালাউন

-বাবা! এনেছ তো?
-আজ তো দোকান বন্ধ বাবা, হরতাল!
-কে বলেছে দোকান বন্ধ? সামিনকে দেখলাম কিট-ক্যাট খেতে!
-সামিনের বাবা হয়ত কাল কিনে রেখেছে।
-তুমি কেন কিনে রাখোনি?
-তুমি তো আমাকে আগে বলোনি বাবা!

ছেলেটা অস্ফুট স্বরে কি একটা বলে চলে যায় বারান্দায়। চোখের কোণে একটু জল উঁকি দেয়। আর বাবার বেরিয়ে আসে চাপা দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু কে বলবে বাবার কথার সবটুকু ছিল মিথ্যা? কার দেখার সময় আছে যে বাবা অভাবের কারণে ছেলেটাকে বোকা বানিয়ে রেখেছে আজ কয়েকদিন। হরতালের অজুহাতে অফিস খুলছে না। বেতনটাও আটকে গেছে। আটকে গেছে বলাটা ভুল! তিনি কেরাণী বলে তার বেতনের দিকে কারো খেয়াল নেই। বড় ছেলের কোচিংয়ের বেতন এ মাসেও বাকি পড়ে গেল...
কষ্টে-সৃষ্টে একটা রুমে বাবা-মা, দুই ছেলে থেকে, আরেকটা রুম সাবলেট দিয়েছে, অভাবটা যাতে একটু কমে! কিন্তু সব বৃথা চেষ্টা! অভাব যায়না! তার উপর বাড়িওয়ালার নোটিশ এ মাস থেকে ৩০০ টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। চোখে সর্ষেফুল-ই শুধু দেখা যায়! আবার নতুন জ্বালা হয়েছে শ্বশুর বাড়ির দাওয়াত। কিছু একটা না নিয়ে গেলে যে মান সম্মান বাঁচে না। মাসের মাত্র ১০ তারিখ। কীভাবে চলবে আর ২০ টা দিন?

সামনে আবার পহেলা বৈশাখ! বড় ছেলে বায়না ধরবে নতুন পাঞ্জাবির। বউ চাইবে ইলিশ মাছ। এগুলো না দিয়ে কি করে তাকাবেন তাদের চেহারার দিকে?

কড়া রোদ উপেক্ষা করে বের হয়ে গেলেন সুজিত বাবু। কিছু একটা কাজ করে আজকের দিনের বাজারটা জোগাড় করতে হবে। পাড়ার হেকমত ভাইয়ের কাছ থেকে রিকশা নিলেন একটা। মুখে রুমাল বেঁধে সেই রিকশা নিয়ে বারিধারা গেলেন একটু বেশি ভাড়া পাবার আশায়! এক বড় সাহেবকে উঠিয়ে কিছুদূর চালিয়ে নেবার পর হঠাৎ করেই রিক্সা থামিয়ে দিল পুলিশ! "লুঙ্গি পরে বের হয়েছেন যে তিনি!!" এটা ছোটলোকের পোশাক! এখানে মানায় না...

বড় সাহেব দাঁত মুখ খিঁচিয়ে নেমে গেলেন রিক্সা থেকে। একটা পয়সাও দিলেন না... হতাশ হয়ে দেখলেন এক প্যান্ট পরিহিত রিক্সাওয়ালার রিক্সায় উঠে যেতে... রিক্সাটা যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ চেয়ে থাকলেন। এবার চিন্তা পল্টনের দিকে যাবেন। ওদিকে সাধারণ মানুষ বেশি।

কাকরাইল মোড়ে কিছু পাঞ্জাবি পরা মানুষ দেখি রিক্সা থামাচ্ছে!

-ওই খালি যাবি?
-কই যাবেন?
-বনশ্রী!
-নাহ যামু না!
-ক্যান যাবি না?
-এমনি!
-সমিস্যা কি তোর? ওই কাদের এদিকে আয় তো! এই হালারে ধর!!!

-কিরে কিচ্ছে তোর? না গেলে কলেমা পড়তে হইব! নাইলে ছাড়া পাবি না! কলেমা পড়!

বুক প্রচুর কাঁপছে। সাথে তীব্র তৃষ্ণা। মুসলমানদের ভালো জানতেন তিনি। এ কোন মুসলমান? দেশে কি হচ্ছে এসব? রঞ্জিত বাবু কোলকাতা যাবার সময় বলে গেছেন, "সুজিত দাদা, এদেশ ৪৭-এর পরের সময়ে ফিরে গেছে। আমার সাথে চলুন। এখানে থাকলে যেকোন সময় মরবেন!"

-কিরে কলেমা পড়স না ক্যান?
-আমি হিন্দু!
-ওই মালাউন পাইছি রে! ধর!!!

এরপর শুধু ভেসে আসে অবিরত লাঠির আঘাতের শব্দ। চাপা আর্তনাদ।

আর তিনি গহীন অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে বলেন, বাবা সুদীপ, বাবা সুব্রত! আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা! এদেশে তোদের জন্ম দিয়ে আমি ভুল করেছি। বউ, তুমি ছেলে দুটোর খেয়াল রেখো। পারলে এদেশ ছেড়ে চলে যাও! দেশকে অনেক ভালোবেসেছিলাম। দেশ আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। এখানে আর না! আমি চললাম....

(Courtesy - Rkz Shuvo)

No comments:

Post a Comment