Friday, April 26, 2013

পানির অভাবে মারাই গেলেন সোনিয়া

দুনিয়ার এই নিষ্ঠুরতাকে কিভাবে আমি মেনে নেব ? কাকে দোষ দেবো ? লোভ-লালসার এই নীতিকে নাকি লোভী হায়েনাদের অকর্ম কে ?
সত্যিই আজ নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হচ্ছে ! কেনো আমি হতে পারলাম না এই লাশের মিছিলের সাথী।

মারা যাবার আগে এক ফোটা পানির জন্য কতোই না ছটফট করেছে মেয়েটি। পানি না পেয়ে মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন রানা প্লাজায় আটকা পড়া সোনিয়া। এর ফলে মৃত্যু ঘটল একটি সুন্দর স্বপ্নের। গত তিনটি দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে হেরে যেতে হলো এই তরুণীকে।

সোনিয়া নামের ওই তরুণী মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতেন, একটি সুখের সংসার হবে শিগগিরই তার। আসবেন স্বপ্ন পুরুষ। আগামী মে মাসের কোনো এক সময় তার বিয়ের সব প্রস্তুতি চলছিলো পারিবারিক ভাবে।

শুক্রবার বিকেলের কোনো এক সময় সোনিয়া মারা যান। সোনিয়ার মারা যাবার বিষয়টি বাংলানিউজকে জানিয়েছেন তারই বড় বোন তানিয়া। সন্ধ্যায় প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন তানিয়া। আবেগ আপ্লুত আর কান্না জড়িত কণ্ঠে তানিয়া বলেন, “ভাইয়া, আমার বোনটি বিকেলে মারা গেছে। শুধু পানির অভাবে ও মারা গেলো।”

উল্লেখ্য, বুধবার ঘটনার পর থেকে পাগল হয়ে নিজের বোনের খোঁজে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিলেন সোনিয়ার বড় বোন তানিয়া। বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে বাংলানিউজ বলেছিলেন, “আমার বোনকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

সেদিন তানিয়া নিজের বোনের এক কপি ছবি দেখিয়ে জানিয়েছিলেন, ধসে পড়া রানা প্লাজার ৫ম তলায় কাজ করতেন তার বোনটি। নাম সোনিয়া। গ্রামের বাড়ি বরিশালে।

তানিয়াও কাজ করেন একটি গার্মেন্টেসে। বুধবার সকালে কাজে যাবার আগে শেষ কথা হয় ছোট বোনের সঙ্গে তানিয়ার।

তানিয়া বলেছিলেন, “সোনিয়া আমার ছোট ছিলো। বাবা মারা যান ২০০৬ সালে। এরপর সংসারের অভাবে আমি কাজ করতে আসি ঢাকায়। এরপর আসে ও (সোনিয়া)।”

সেই বোনটিরই মৃত্যুর খবর জানিয়ে তানিয়া আরও বলেন, “গত তিনটি দিন আমার প্রিয় বোনটির কতোই না কষ্ট হয়েছে। পানির অভাবে কতোই না ছটফট করেছে। শুধু একটু পানির অভাবে মারা গেলো আমার লক্ষী বোনটি। কার কাছে এর বিচার চাইবো আমি?”

আর বলতে পারলেন না তানিয়া। কথা আটকে যাচ্ছিল বারবার- “এ কেমন পাশবিক দুনিয়া। আমি আমরা মাকে কি জবাব দেবো?”

অনেকটা ক্ষোভ আর দুঃখ নিয়ে বলেন, উদ্ধার হওয়া সোনিয়ার পাশের এক সহকর্মী তাকে জানিয়েছেন, সোনিয়া শুধু পানির অভাবে মারা গেলো। ওর শরীরে কোনো আঘাত ছিলো না। ও সুস্থ ছিলো। কিন্তু প্রচণ্ড গরম আর অক্সিজেনের অভাব ছিলো ওরা যেখানে আটকা ছিলো। গায়ে কাপড় পর্যন্ত রাখতে পারছিলো না মেয়েটি।

পানি না মেয়ে সোনিয়া তার পাশে থাকা ওই সহকর্মীকে কামড় দিয়ে রক্ত পর্যন্ত খেতে চেষ্টা করেছেন। বারবার তার কাছে আকুতি করেছেন, একটু পানির জন্য।

“মৃত্যুর আগে এক ফোটা পানি আমি আমার বোনকে খাওয়া পারলাম না”- বলে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন তানিয়া।

তানিয়া বলেন, “বাইরে এতো পানি, খাবার ও অক্সিজেন রয়েছে। কিন্তু ভেতরে এসব দেওয়া হচ্ছে না কেন”

“ভেতর পানি দেওয়া হলে কি আমরা বোনটি মরতো”- প্রশ্ন রাখেন তানিয়া।

আজ তানিয়ার আর কিছুই চাওয়ার নেই। শুধু বললেন, “আমার বোন মারা গেছে। আমি আর দুঃখ করছি না। কিন্তু ওখানে যারা আটকরা আছেন, তাদেরকে আপনার বাঁচান। পানি, খাদ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন। পানির অভাবে হয়তো আরো অনেকে মরছেন।”

“মাকে আমি কি জবাব দেবো? আমি কিভাবে ওই পানি খাবো? আমার বোন যে একটু পানির জন্য মারা গেলো। আমার নিজের আজ বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। এই দুঃখ কিভাবে বইবো আমরা? লাশটি পর্যন্ত পাবো কিনা জানি না” কান্না জড়িত ভাবে বলছিলেন বোনহারা এই তরুণী।

(সূত্র: বাংলা নিউজ ২৪)

No comments:

Post a Comment