Saturday, July 19, 2014

রমজানের সংযম

কয়েকবছর আগে সিলেটে রমজান মাসে মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে আছি, কয়েকজন চাপদাড়ি এবং সাদা পাঞ্জাবি পড়া তরুণ আমাকে ধর্মবিষয়ে নসিহত করতে এগিয়ে এলো। ছেলেগুলো শিবির সদস্য, তাদের রমজানের কার্যক্রম হচ্ছে রাস্তায় রাস্তায় ওয়াজ নসিহত করা। সাধারণত তাদের দেখলেই লোকজন কাজ আছে বলে কেটে পরে, কিন্তু আমি কেটে পরলাম না। আমার নাম জিজ্ঞেস করলো, নাম বললাম। তাতেই তারা নিশ্চিত হলো আমি মুসলমান। এরপরেই শুরু করলো বয়ান। আমার কলবে কী আল্লাহর ভয় নাই? আমার দিলে কি মুহাম্মদের জন্য ভালবাসা নাই? আমার কী ইসলামের জন্য জিহাদ করে জীবন দিতে ইচ্ছা করে না? আমি উদাস ভঙ্গিতে তাদের সামনেই একটা বিড়ি ধরিয়ে বললাম, নারে ভাই, আমার এত চুলকানি নাই।
এরপরে শুরু করলাম আসল কথা। কোরানের কোন আয়াতে কী আছে, হাদিসে কী কী হাবিজাবি আছে, মুহাম্মদ সাহেব আসলে কেমন লোক ছিলেন, সবই বিস্তারিত বলতে শুরু করলাম। দেখলাম ক্রমশ তাদের চেহারা লাল হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষণ তাদের চেহারায় ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস, যেন এক পাপী বান্দাকে তারা বেহেশতের পথ দেখিয়ে তার জীবন ধন্য করে দিচ্ছে। এরপরে তাদের চেহারা হয়ে উঠতে লাগলো ভেঙ্গে পরা এক একজন মানুষের মত। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তাদের পরণের কাপড় আমি খুলে নিয়েছি, লজ্জা ঢাকতে তারা এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। মৃদু প্রতিবাদ তারা করতে চেষ্টা করলো, কিন্তু তারা ছিল আমার কাছে শিশুমাত্র। এদের গুরুদেরও আমি অনেক নাকানি চুবানি দিয়ে এসেছি। তারা তখন আমার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার চেষ্টায় ব্যস্ত, বলতে লাগলো ভাই আমাদের কাজ আছে। পরে এক সময় আলাপ হইবো নে। আমি বললাম আরে রাখেন কাজ। দ্বীনের কাজ সবার আগে। এখন বলেন দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্ক এই যুগে কতটা বাস্তব? আপনার পিতা যদি আপনার বাসার কাজের লোকের সাথে সম্পর্ক করে, আপনি কীভাবে নেবেন? আপনার পিতা যদি দশ বারোটা বিবি রাখে, নাতনীর বয়সী বালিকা মেয়ে বিয়ে করে, আপনার অনুভূতি কেমন হবে? তাদের অবস্থা তখন ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি। একটু পরে তারা দৌড় দিলো, দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেল। আমার সাথে একজন ছেলের কাছে শুনলাম, তারা লোকজন ডাকতে গেছে। আজকে আমারে পেলে খুন করবে।
বিড়ি খেতে খেতে বের হলাম, আমার হাতে বিড়ি দেখেই কয়েকজন লোক তেড়ে এলো। বললো রমজান মাসে এই শহরে বিড়ি খাওয়া যাবে না। আমি বললাম, আমার বিড়ির গন্ধ তো আপনাদের কাছে যাচ্ছে না। তো আপনাদের সমস্যা কী? তারা বললো, কোনভাবেই বিড়ি খাওয়া যাবে না। এইটা এইখানকার আইন। আমি বললাম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কিংবা নাস্তিকদের জন্য তো এই আইন প্রযোজ্য নয়। আপনার ধর্ম আপনি পালন করেন, সেইটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আপনি তো আমার ওপর আপনার ধর্ম চাপাতে পারেন না। তারা বললো, আমার বিড়ি খাওয়া নাকি তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত! আমি বললাম, কোন হিন্দু যদি বলে, আপনারা কোরবানির ঈদে গরু কোরবানি দিতে পারবেন না, সেটা তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত, তাহলে কী আপনারা গরু কোরবানি দেয়া বন্ধ রাখবেন?
তাদের রক্তচক্ষু দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল, তারা সম্ভব হলে আমাকে জবাই করে ফেলতো। আমার বিড়ি খাওয়া তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। কিন্তু আমি কেন আরেকজনার ধর্ম পালনের জন্য আমার খাওয়া দাওয়া বন্ধ রাখবো? আমি তো মুসলমান না। তাদের ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষণাবেক্ষণের দায়ও আমার নেই। আমি তো বলি নি, তারা রোজা রাখলে তা আমার অবিশ্বাসানুভূতিতে আঘাত করছে, তাদের সারাদিন কিছু না খেয়ে থাকতে পারবে না। তাদের খাওয়া দাওয়া করতে হবে। তাহলে তারা কেন আমার জীবন যাপনে তাদের ধর্ম চাপানোর চেষ্টা করছে? কোনটাকে সংযম বলে, একজন রোজার মাসে বিড়ি খাচ্ছে, তা দেখে তাকে হত্যা করতে চাওয়াকে সংযম বলে, নাকি একজন নাস্তিক মুসলমানদের রোজা রাখার ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে না, তাকে খাওয়া দাওয়া করতে বাধ্য করছে না, কিছু না খেলে তাকে কতল করতে চাচ্ছে না, তাকে সংযম বলে? নাস্তিকরা বেশি সংযমী নাকি ধার্মিকরা? কারা অন্যের প্রতি বেশি সহনশীল?
তাদের ধর্মকে সম্মান জানিয়ে আমার না খেয়ে থাকতে হবে? তারা সম্মান প্রত্যাশা করে? কিন্তু রমজান মাসে আমার খাওয়া দাওয়া করার অধিকারকে কী তারা সম্মান জানাচ্ছে? আমার ধর্ম পালন না করার অধিকারের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল? কোন অধিকার বলে তারা আমার ধর্ম পালন না করার অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে? শ্রদ্ধা কী একপাক্ষিক হয়? তাদের সংখ্যা বেশি, এবং তারা ভয়ংকর, সেটাই কী সম্মান দাবী করার একমাত্র যুক্তি?
আমি মনে করি না, বেশীরভাগ মুসলমান এরকম। এই রকম মৌলবাদীর সংখ্যা অত্যন্ত সামান্য। এলাকার এমপি যেমন কিছু পাতি গুণ্ডা লালন পালন করে, এরাও হচ্ছে ঈশ্বরের পালিত পাতি গুণ্ডা বাহিনী। যেখানে আমি রমজানে বিড়ি খেলে খোদ ঈশ্বরেরই কোন সমস্যা হচ্ছে না, সেখানে এরা চলে আসে মাতব্বরি করতে। সূর্যের চেয়ে বালি গরম! এবং বেশিরভাগ সাধারণ মুসলমান এই ধরণের লোকদের পছন্দও করে না, কিন্তু তারা তাদের ঘাটায়ও না, প্রতিবাদও করে না এদের কাজের। কারণ তারাও ভয় পায়, এই মৌলবাদী রগকাটা চাপাতি মারা ধর্মান্ধদের। কিন্তু দিনশেষে ইসলামের এবং মুসলমানের যেই চিত্র মানুষের মনে গেঁথে যায়, তা এই মৌলবাদী মুসলমানদের চেহারাই। জন্মসূত্রে মুসলমান, একজন ভাল মানুষ যখন পাশের বাড়ির হিন্দু মেয়েটাকে মুসলমান মৌলবাদীদের ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করে, তখন সে তা মানুষ হিসেবেই করে। আর মুসলমান মৌলবাদীরা যখন হিন্দুদের মূর্তি ভাঙে, তখন তা মুসলমান হিসেবেই করে। কারণ তাদের নবীও ৩৬০টা মূর্তি ভেঙ্গে তাদের মূর্তি ভাঙায় অনুপ্রাণিত করে গেছেন।
আর সংযম পালন? হাঃ হাঃ হাঃ সারাদিন না খেয়ে থেকে সন্ধ্যায় খাবারের ওপর হামলে পরা, সারারাত ঠেসে ঠেসে ভুঁড়ি ভোজন করাকে সংযম পালন বলে বুঝি? রমজান মাসে জিনিসপত্রের দাম এত আকাশচুম্বী হয় কীভাবে? আর সংযম পালনই যদি হয়ে থাকে, ধর্ম পালন না করা মানুষদের প্রতি তাদের এই অসংযমী মনোভাব কীভাবে? একমাস না খেয়েই যদি সংযমের শিক্ষা পাওয়া যায়, এরা এত মারমুখী কেন?
কিছুক্ষণ পরেই এক সরকারি কর্মকর্তার সাথে দেখা করতে হলো। সে রোজা ছিলেন, মুখ শুকনো করে ঘুষ চাইলো। আমি বললাম, এখন তো রমজান মাস, সংযম পালন করেন। সে বললো, বোঝেনই তো, সামনে ঈদ। ভাবলাম, বেশ ভাল সংযমের শিক্ষা দিচ্ছে এই রোজা! রোজা নাকি মানুষকে সংযমের শিক্ষা দিচ্ছে! এই রমজান মাসেই ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারি, এই সবই ভয়াবহ রকমের বেড়ে যায়, এটা বোধকরি সবচাইতে ধার্মিক ব্যক্তিও অস্বীকার করতে পারবে না। আর ঐদিকে ইহুদী নাসারা নাস্তিকদের দেশে কেউ রোজা সংযম পালন না করেও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোথাও ঘুষ দেয়ার কথা কেউ চিন্তাও করছে না! জার্মানির এক মন্ত্রী ক'দিন আগে কিছু টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ায় এখন জেলে যাচ্ছে। মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছামত পোশাক পড়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ তাদের স্পর্শ করার সাহসটুকুও করছে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না মেয়েটা নিজেই অনুমতি দিচ্ছে। তারা নদীর পাশে সান বাথ করছে, কেউ তাদের ওপর হামলে পরছে না। এই রকম পোশাক যদি ঢাকার রাস্তায় পড়ে কেউ ঘুরতো, নির্ঘাত শ'খানেক লোক তাকে ধর্ষণ করে ফেলতো। তার মানে কী, ইউরোপের পুরুষেরা সব নপুংশক? তারা ধর্ষণ করতে জানে না? তারা ধর্মান্ধ রোজাদারদের মত লালা ফেলতে জানে না? বহু ধর্মের, বহু মতের নানান মানুষ ইউরোপের বাসিন্দা, তারা কেউ কারো ব্যক্তিগত ধর্মপালন না পালনে মাথা ঘামায় না। তাদের কী ঈমানী জোশ নাই?
কী আশ্চর্য! মাস ভর সংযম পালন করে মুসলমানরা, আর সংযমী হয় ইহুদী নাসারা নাস্তিকরা!

(সূত্র

No comments:

Post a Comment