Saturday, August 23, 2014

12 Years A Slave

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ:
আগেই বলে নিচ্ছি নিচের লেখাটি গত বছরের Oscar বিজয়ী 12 Years A Slave নিয়ে রচিত। কেউ যদি এটি না দেখে থাকেন এবং দেখার ইচ্ছা আছে ও ঘটনা আগে জেনে ফেলতে ইচ্ছুক নন, তারা বাকি আর পড়ার প্রয়োজন নেই। আর যদি মনে করেন, এটি দেখার কোনো ইচ্ছা নেই বা ঘটনা আগে জেনে ফেললে কোনো সমস্যা নেই, তারা পড়া চালিয়ে যেতে পারেন।

--------------------------------------------------------
সেদিন গত বছরের Oscar প্রাপ্ত ছবি "12 Years A Slave" দেখলাম। ছবিটা দেখলাম আর বার বার নানা দিক দিয়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের কথা মনে পড়ল। জানিনা, কতটুকু সত্যতা আছে আসল বইয়ের সাথে (ছবিটি এক প্রকৃত দাসের [যিনি মূলতঃ স্বাধীনই ছিলেন] জীবনীর উপর ভিত্তি করে), তবে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাসের দাসত্ব প্রথা সম্পর্কে অনেক বিষয়ই বর্তমান সময়কার বাংলাদেশী হিন্দুদের মিলে যায়। এই ছবির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিছু এমন সাদৃশ্যগুলো নিচে তুলে ধরলাম -

১. ১৯৭১ সালে যেমন হিন্দুদের মুসলিম সেজে কিংবা কোরআনের কিছু আয়াত মুখস্থ করে তা বলে পাকিস্তানীদের হাত থেকে বাঁচতে হতো, তেমনি এই ছবির প্রধান চরিত্র Solomon Northup-কেও নিজের প্রকৃত পরিচয় (যে সে একজন উত্তরাংশ [New York] এর বাসিন্দা এবং বৈধভাবে স্বাধীন একজন ব্যক্তি যার পরিবার-পরিজন আছে আর তারাও স্বাধীন; তাছাড়া, তার নিজস্ব বিশেষ গুণাবলী যে সে একজন বেহালা বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী) সবই গোপন রাখতে হয়েছিলো, নতুবা আরো মার খাওয়া লাগবে। অবশেষে তাকে তার বিক্রেতার দেওয়া নাম "Platt" দিয়ে পরবর্তী ১২ বছর জীবন কাটাতে হয়। যদিও সে প্রথমদিকে অস্বীকার করছিলো যে, না, তার নাম Solomon, কিন্তু মারের চোটে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়, নতুন নাম গ্রহণ করতে। বর্তমান সময়ে যেমন ইসলাম ধর্ম সকল বিশ্বে প্রচার করে বেড়ায় যে, "ইসলাম শান্তির ধর্ম"। মনে হয় যেন, মার দিয়ে হলেও মুখ থেকে বের করাবে যে "ইসলামই শান্তির ধর্ম"। যদিও ব্যক্তি নিজের মনে মনে অন্য ধারণা পোষণ করতে পারেন, কিন্তু বাহুবলের দাপটের কাছে তার মনের শক্তি খুবই ক্ষীণ।

২. দাস-দাসীদের প্রভুরা রোববারগুলোতে বাইবেল থেকে কিছু নির্দিষ্ট অংশ পাঠ করে শুনাতো। আর সেগুলোতে এমন বাক্যগুলোই তারা চয়ন করত, যে দাসেরা বুঝত, বাইবেলে যে "master" ও "servant" বলা হচ্ছে সেটা তার আর তার প্রভুকেই বোঝানো হচ্ছে। বর্তমান সময়ে যেমন মুসলিমরা হিন্দুদের বেদ-গীতা বা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকে নির্দিষ্ট অংশ বাছাই করে নিয়ে তার ভুল অপব্যাখ্যা দেয় (জাকির নায়েক যাতে পারদর্শী) সেরকমই সেকালের প্রভুরাও দাসদের manipulate করার জন্য এমনটিই করত।

৩. ছবিটিতে দেখানো হয়েছে প্রথম যিনি Solomon Northup-কে কেনেন তার ভিতর কিছুটা হলেও মায়া-দয়া ছিলো। তিনি ওকে বেহালা উপহার দেন। কর্মক্ষেত্রে supervisor এর চেয়েও ওকে বিভিন্ন সময় প্রাধান্য দেন। ফলে এটুকু পরিষ্কার সকল শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা এক নন। এমনকি একটা পর্যায়ে এটা বোঝানোও হয়েছে যে, ওই ব্যক্তি দাসত্ব প্রথা পুরোপুরি সমর্থন না করলেও তার বাপ-দাদার সম্পত্তি দেখাশোনা ও ফসল-ফলাদির জন্য তাকে দাসেদের উপর নির্ভর করতেই হয়। কিন্তু তাই বলে তাদের উপর কঠোর হওয়ার পক্ষে নন তিনি। বাংলাদেশে এখনো কিছু মুসলিম আছেন যারা হিন্দুদের সম্মান-মর্যাদা দেন বলেই হিন্দুরা এখনো সেদেশে টিকে আছে। তাই সবাইকে এক কাতারে মাপাটা কখনোই সমীচীন নয়।

৪. এক পর্যায়ে Solomon/Platt এর সাথে supervisor Tibeats এর বাক-বিতন্ডা দেখা দেয়। ফলশ্রুতিতে সেই supervisor Tibeats এর সাথে Solomon এর মারামারিও হয়। পরবর্তীতে তার উপরের supervisor এসে মারামারি থামান। কিন্তু আগের ব্যক্তি ক্ষান্ত হন না। পরবর্তীতে Tibeats লোকজন নিয়ে এসে Solomon-কে ফাঁসিতে ঝোলানোর ব্যবস্থা করছিলেন। তখন তার উপরের supervisor এসে আবারও এটি থামান। কারণ বড় বাবু বাড়ি না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দাসেরা উনার কেনা। তাই বলে সেই supervisor কিন্তু Solomon-কে ফাঁসীর দড়ি থেকে বের করে আনলেন না। কিংবা হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলেন না। ভাবখানা এমন যেন, মার খাচ্ছে খাক, কষ্ট ভুগছে ভুগক, nigger-ই [মালোয়ানের মতোই তখনকার সময়ের গালি] তো। বাংলাদেশেও ঠিক তেমনই অবস্থা। যখন বিএনপি-জামায়াত হিন্দুদের আক্রমণ করে, আওয়ামীরা চুপ করে দেখে, যেন মার খাচ্ছে তো খাক না, মালোয়ানের বাচ্চাদের এর চেয়ে বেশী সুখ কেমনে আশা করে এইদেশে? সেইসময় তারা সবাই ভাই-ভাই। দল-মত নির্বিশেষে তারা তখন এক।

এমন আরো ছোটখাটো বিষয় আছে যা এই ছবি দেখলে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিংকন নামক এক শ্বেতাঙ্গই কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গদের স্বাধীন করার জন্য কংগ্রেসে লড়েন এবং অবশেষে আততায়ীর গুলিতে মৃত্যুও বরণ করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশে হিন্দুদের ক্ষেত্রেও এমন এমন একজন মুসলিম প্রভাবশালী ব্যক্তিরই প্রয়োজন, যিনি হিন্দুদের তরে মৃত্যুকে বেছে নিতে পিছপা হবেন না। যিনি তার রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক দাপটের জোড়ে সকলকে একমতের মতাদর্শী করতে পারবেন।

সেইসাথে অবশ্য আমাদের হিন্দুদের মধ্য থেকে Martin Luther King Jr. এর মতো ব্যক্তিত্ত্বও প্রয়োজন হবে। তারা স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য শতে শতে মৃত্যুবরণ করেছে, নিপীড়ন সহ্য করেছে, কিন্তু তবুও অহিংসার পথ থেকে সরে আসেনি। ঠিক তেমনি আবার Malcolm X এর মতো উগ্র ব্যক্তিত্ত্বও ছিলেন যিনি তার অনুসারীদের নিয়ে passive action এর চেয়ে direct action এ বিশ্বাস করতেন এবং আইন-আদালত গ্রাহ্য না করে, কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়েই বাহিনীর মতো তৈরি করেছিলেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতাও ঠিক তেমনি শুধুমাত্র মহাত্মা গান্ধীর প্রচেষ্টাতেই সফল হয়নি। নেতাজী সুভাষ বসুর মতো সাহসী, নির্ভীক ব্যক্তিত্ত্বরও প্রয়োজন ছিলো। আমাদের বাংলাদেশের হিন্দুদের মধ্যে কবে গান্ধী-King কিংবা নেতাজী-Malcolm X এর মতো ব্যক্তিত্ত্ব জন্ম নিবেন? সেই অপেক্ষারই পালা ....

No comments:

Post a Comment