Friday, April 08, 2016

ফেসবুকে ঘৃণার সংস্কৃতি

বুয়েটের সুনামখ্যাত চমক হাসানের লেখাটা ঠিক আমার এ সপ্তাহের আগের লেখাটারই সূত্র ধরে বলা কিছু কথা ...
একটা কুযুক্তির কথা বলি। ‘ওমুক, ওমুক অমুক খারাপ করেছে তাই আমিও খারাপ করলাম’ কিংবা ‘ওরা যদি এমন করে আমি করব না কেন?’। এভাবে অন্যের খারাপের উদাহরণ দেখিয়ে নিজের খারাপটাকে ঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা প্রায়ই দেখা যায়। চিন্তাটা ভুল এবং বিপজ্জনক। খারাপে খারাপে কখনও কাটাকাটি হয় না, বরং খারাপ বাড়তে থাকে। -৫ আর -৫ যোগ হয়ে ০ হয়ে যায় না, বরং -১০ হয়, মানে আরো খারাপ হয়।
ধরা যাক ভারতের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সোশ্যাল মিডিয়া খুবই খারাপ। ওদের কিছু বিজ্ঞাপনের ভাষা জঘন্য এবং অসম্মানজনক। এখন আমরা যদি পালটা জবাব দিতে গিয়ে একইরকম বা তার চেয়ে বেশি খারাপ হয়ে যাই, সেখানে কোনই গর্ব নেই, মাহাত্ম্য নেই। খারাপে খারাপে কাটাকাটি হয় না!
ভারত এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে খেলা হলো, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতল। খুশি হয়েছি আমিও, যেহেতু ক’দিন আগেই আমরা ভারতের কাছে হেরেছি, ভারত হারলে আমি খুশি হতে পারি। কিন্তু টানা তিনদিন চারদিন ধরে যখন এই উল্লাসটা মানুষের ভিতর রয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে একটা বড় ভুল হয়েছে কোথাও! এই খেলাতে তো বাংলাদেশ নেই, বাংলাদেশ তো জেতে নি। তার মানে এই উল্লাস এসেছে ঘৃণা থেকে! কী প্রচণ্ড ঘৃণা আরেকটা দেশের প্রতি আমার দেশের মানুষের। এটা খুব ভালো কিছু নয়। আমি যখন অন্যকে আমার শত্রু ভাবি, ঘৃণা করি- অন্যরা হয় আমাকে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য করবে, নয়তো আমাদেরকে শত্রু ভেবে ঘৃণা করবে। দুটো জিনিসের কোনটাই আমি মেনে নিতে আরি না। আমার দেশকে, আমার দেশের মানুষকে কেউ ঘৃণা করছে বা অবজ্ঞা করছে এটা ভাবতে আমি প্রচণ্ড কষ্ট পাই।
আমি কী চাই? আমি চাই পৃথিবীর মানুষ আমাদের দেশের মানুষকে ভালোবাসুক, শ্রদ্ধা করুক। সেটা কখনই হবে না যদি অন্ধ ঘৃণার বিকৃত সংস্কৃতি চলতেই থাকে। ঘৃণা ভয়ঙ্কর একটা ব্যাধি- শুরুতেই লাগাম না দিলে বাড়তেই থাকে। পাকিস্তান আমাদের চিরশত্রু, ভারত আমার শত্রু, ইংল্যাণ্ড আমাদের দুশো বছর শোষণ করেছে- ওরা তো বড় শত্রু, ওদেরকে ঘৃণা করি। অস্ট্রেলিয়া তিন মোড়লের একটা- তাই ওরা আমাদের শত্রু, ঘৃণা করি। নিউজিল্যান্ডকে আমরা নিয়মিত বাংলাওয়াশ করি, তাই ওদেরকে তাচ্ছিল্য করি। জিম্বাবুয়ে আর খেলতে পারে না, ওদের করুণা করি। অন্যদেরকে কবে ঘৃণা করতে শুরু করব তার জন্য মুখিয়ে থাকি।
এবং এরপর আমরা আশা করি, সবাই বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখবে!
না, এভাবে সম্মান আসে না। ১৬ কোটি ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে ১৫০ কোটি ঘৃণা অর্জন করাটা সম্মানের নয়। সম্মান আসে প্রথমত যোগ্যতা দিয়ে, দ্বিতীয়ত অন্যকে সম্মান দেওয়ার মাধ্যমে।
কিভাবে আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাব সেটা শেখাটা জরুরী।
ক্রিকেটে ভারতের সাথে আমাদের বৈরিতা। তাই বলে ভারতে একটা মেয়ে ধর্ষিত হলো- আর সেটা দেখে আমি যদি মনে মনে খুশি হই আর বলি- ‘দ্যাখ, তোদের দেশের কী অবস্থা?’ –নিশ্চিত জেনে রাখুন সেটা অন্যায়। ওদের বহু মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না দেখে যদি আমি কদর্য উক্তি করি- সেটা অন্যায়।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান আমাদের দেশের মানুষের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে, এবং ওরা ক্ষমা চায় নি ওদের কৃতকর্মের জন্য। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দেশটার প্রতি আমাদের ক্ষোভ থাকা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। তারপরও যদি পাকিস্তানে একটা ভূমিকম্প হয় এবং তাতে বহু মানুষ মারা যায় –আর সেটা দেখে আমি উল্লাস করি আর বলি ‘ঠিক হইসে- তোদের উপর গজব পড়সে’- সেটা নিঃসন্দেহে অন্যায়। পাকিস্তানে জঙ্গী আক্রমণে মানুষ মারা গেলেও আমরা খুশি হতে পারি না।
যেই কষ্টগুলো মানবতার- সেখানে ব্যক্তিগত উল্লাস বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দেয়।
ক্রিকেটের কথা বলি। কারো পরাজয় নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করাটা গৌরবের নয়, সুরুচিপূর্ণ নয়। বিজয় নিয়ে আনন্দ করা যায়। ওয়েস্ট-ইন্ডিজ ভারতের খেলায় একারণেই মুশফিক লিখতে পারেন না, ‘ইন্ডিয়া হেরেছে তাই আমি খুশি’, তিনি লিখতে পারেন ‘ভালো খেলেছ ওয়েস্ট ইন্ডিজ! আমি খুশি’। এটা সুন্দর ব্যাপার যে তিনি ভুল বুঝতে পেরে দ্রুতই সংশোধনীর পদক্ষেপ নিয়েছেন।
দেশের প্রথম সারির পত্রিকা যদি ন্যাড়া মাথার ভারত ক্রিকেট দলের ছবি ছাপে, সেটা অবিবেচকের আচরণ এবং অন্যায়। ধোনির কাটা মাথা তাসকিনের হাতে বসালে সেটাতে তাসকিনের গৌরব প্রকাশ পায় না, সেটা একপ্রান্তে বয়ে আনে বিকৃত উল্লাস- আরেকপ্রান্তে ঘৃণা- এর কোনটাই ভালো না। এমন উদাহরণ আরও অনেক দেয়া যেতে পারে। মূল কথা সামান্যই।
আমাদের প্রতিক্রিয়াগুলো আরও পরিশীলিত হোক। অন্যের কষ্টে থাকুক সমবেদনা, অন্যের অর্জনে দিই প্রাপ্য সম্মান। অন্যের কু-আচরণে হই ধৈর্যশীল, জবাব দিই যোগ্যতায়। যোগ্যতর হয়ে ওঠার চেষ্টা থাকুক সবসময়।
সম্মান, অর্জন আসে এভাবেই।
(সূত্র)

No comments:

Post a Comment